অনুগল্প | জীবন যে রকম | পুবালি ঘোষ

0

 জীবন যে রকম

পুবালি ঘোষ

ছোট্টো শব্দ। জীবন। তার এক প্রান্তে আলো। আরেক প্রান্তে আঁধার। এক শাখায় সুখ। অপর শাখায় দুঃখ। এক দিকে খুশী। অন্য দিকে বেদনা। এক চলনে আনন্দ। অপর চলনে যন্ত্রণা। কখন কোনটি যে কার প্রতি বর্ষিত হবে তা অজানা। প্রতি মোড়ে মোড়ে, প্রতি বাঁকে বাঁকে শুধু অজানা রহস্য। 
            সেই আলো আঁধারের পথ বেয়ে চলতে চলতে দিয়া আজ এতো গুলো বছর পেরিয়ে এলো। কখনো সুখের রেশম স্পর্শে শিহরিত হয়েছে। আবার কখনো দুঃখের আঁধার এমনভাবে ঘিরে ধরেছে, যে মনে হয়েছে এই রাত কেটে কবে আবার সূর্য উঠবে!
            বন্ধুদের সঙ্গে দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছে সে। আনন্দের সাগর থেকে যেন বাণ এসেছে। কতো পুরোনো কথা, পুরোনো স্মৃতি। কিন্তু তারা এখনও কতো উজ্জ্বল। ফিরে গেছে যেন সেই শৈশব - কৈশোরের অমলিন কালে। সেই সুগন্ধি সময়, যেখানে বারবার ফিরে যেতে চাইলেও - ফেরা যায় না সত্যিই। যে বন্ধুর সাথে একদিন দেখা না হলে পৃথিবীর সব আলো যেন নিভে যেতো, আজ সেই বন্ধুই যেন কাছে থেকেও কতো দূর। যার কাছে মনের সব কথার ঝাঁপি খালি করে দেওয়া যেতো, আজ যেন কোথাও একটা বাধা। জীবনের ভুলভুলাইয়া নিজের মতো করে দূরত্ব বাড়িয়ে তুলেছে কি? কষ্ট পায় দিয়া বারবার।
              যে গেস্ট হাউসে তাঁরা আছে, সেটি ছোটো হলেও খুব সুন্দর। সামনে সুসজ্জিত বাগান। ঘর গুলি পরিচ্ছন্ন। সুন্দর করে সাজানো। ঘরে বাগানের ফুল দিয়ে ফুলদানি সাজিয়ে দেওয়া, জল এনে দেওয়া, ছোটো খাটো সব ফরমায়েশ মিটিয়ে দেওয়ার জন্য ছুটে ছুটে আসে একটি ছোটো মেয়ে। খুব বেশি হলে, ন - দশ বছর বয়েস হবে। নাম "ফেলি"। সারাদিন কোনো না কোনো কাজেই আটকে আছে। আর দুপুরের ফাঁকা সময়ে বাগানের গাছতলায় বসে একা একা খেলে। 
                  দিয়া আলাপ করে তার সাথে। মা নেই। বাবা অন্যত্র সংসার করেছে। বৃদ্ধা ঠাকুমা তাকে এখানে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এখন তো ঠাকুমাও গত হয়েছেন। এই বিরাট পৃথিবীতে ফেলির আর নিজের বলতে কেউ নেই। 
            তেমন ভাবে অক্ষর জ্ঞান হওয়ার বা অন্য কোনো শিক্ষার কোনো সুযোগই পায় নি সে। অথচ কী সুন্দর ছবি আঁকার হাত। ছোটো ছোটো কবিতা দিয়ার কাছ থেকে শুনে, মনে রেখে বলতে পারছে এই টুকু সময়েই। লেখাপড়া করতে চায় কি না জিজ্ঞাসা করতেই উজ্জ্বল চোখে এক গাল হেসে রাজি।      
                মনটা কেমন যেন করে উঠলো দিয়ার। গেস্ট হাউসের মালিকের সাথে আলাদা করে কথা বলে সে। ফেলিকে নিজের কাছে নিয়ে এসে লেখাপড়া শিখিয়ে জীবনের পথে নিয়ে আসতে চায় দিয়া। মালিক মানুষটি মোটের উপর খারাপ নন। অনেক কথাবার্তা হবার পর রাজি হন তিনি। ফেলি তো খুব খুশী। আর পরিবার বলতে কেউ নেই বলে সে যেন তার সদ্য পাওয়া দিদিকেই আঁকড়ে ধরলো।
            বন্ধুরা খুব অবাক হলো। মিশ্র মতামত জানাতে থাকলো। দিয়া সে সব কথা কিছু শুনলো। কিছু অযৌক্তিক কথা শুনলো না। "ফেলি"র হাত ধরে যখন বাড়ি ফেরার গাড়িতে বসে আছে, তখন তার মুখের উজ্জ্বল হাসি দিয়ার মনের সব আঁধার কাটিয়ে দিলো একেবারে। 
             দিয়া জানে, সামনে অনেক লড়াই। লম্বা শ্বাস নিয়ে সে প্রস্তুত। নতুন ভাবে জীবনের রাজপথ - গলিপথ দিয়ে নতুন আলোর দিশায় ফেলির সাথে চলতে হবে যে। জীবনকে সঙ্গে নিয়ে। জীবনের অভিমুখে।

পুবালি ঘোষ


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Please Select Embedded Mode To show the Comment System.*

এইখানে ক্লিক করুন 👇👇
4/sidebar/অনুগল্প

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top