শিরোনাম: ☆ মুক্তি ☆
লিখেছেন: ◇ রত্না দত্ত ◇
রাত প্রায় এগারোটা, উফফ এত বৃষ্টির মধ্যে না বেরলেই ভালো হতো বোধ হয়। কিন্তু আগে থেকে কি বোঝা যায় আবহাওয়া কেমন থাকবে? বড্ড মুশকিলে পড়ে গেল আশা। একা মেয়ে এতো রাতে এলাকাটাও তো আচেনা। তারপর এই প্রবল বৃষ্টি। উফফ… কি ভয়ংকর লাগছে এলাকা টা কিন্তু সকালে তো এইদিক দিয়েই এলাম তখন তো মনে হয় নি এমন রহস্যময়। বৃষ্টি সময় এর সাথে সাথে যেন আরও বাড়ল। ভিজে পুরো কাক লাগছে ওকে। ঝড়ের তান্ডব শুরু হল কিছুক্ষণের মধ্যেই। গোটা এলাকাটি জনমানব হীন মনে হচ্ছে। একটা প্রচন্ড শব্দে কয়েক হাত দূরেই ভেঙে পড়ল একটা প্রকান্ড তালগাছ। এবার আশার বেশ ভয় হতে লাগলো। দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল একটা বন্ধ দোকান ঘরের চালের ছাওনিতে। এখানে যদি কোনো যানবাহন পাওয়া যেত তাহলেই আজ রাতের শেষ বাসটা ধরতে পারত, না! আজ আর কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হছে না। তাহলে গোটা রাত টা কাটাবে কোথায়? ও কিছুই ভেবে পাচ্ছে না তবে এটা ঠিক যে বেশিক্ষণ এখানে থাকা চলে না। রাতটাও বাড়ছে হাতঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল বৃষ্টির জল পড়ে অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে ঘড়িটা । শেষ দেখেছিল যখন তখনই এগারোটা বাজছিল।
এখন নিশ্চয়ই এগারোটা তিরিশ, না আর দাঁড়িয়ে থাকা চলে না এবার একটু হেঁটেই এগিয়ে গিয়েই দেখা যাক যদি কোথাও আশ্রয় পাওয়া যায়, এই ভেবে ও হাঁটতে শুরু করল।
চারদিকে শুধু অন্ধকার, এইদিকে খুব একটা লোকজন আসে বলে তো মনে হয় না, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন আলপিনের মত গায়ে বিঁধছে। “আমাকে কি সারারাত এভাবে হেঁটে বেড়াতে হবে কি জানি? কেন যে আজ বের হলাম, একটু লোকালয় এর দিকে গিয়ে দেখি যদি কোথাও আশ্রয় পাওয়া যায়, “ নিজের মনে কথা বলতে বলতে আশা এগিয়ে চলল সামনের দিকে।
বড়ো রাস্তায় পৌঁছতেই খুব দূরে একটা আলো দেখতে পেল, তবে আর পাঁচটা ভুতের বাড়ির মতো হারিকেন এর মিটিমিটি আলো নয়, বেশ উজ্জ্বল আলো, যেন কেউ হাজারটা মোমবাতি একসাথে জ্বালিয়েছে। আলোর উৎসের আনুসন্ধানে আশা এগিয়ে চলল। দূর থেকে যতটা কাছে মনে হছিল জায়গাটা, মোটেও ততটা কাছে নয় বরং অনেকটাই দূর।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় আশা গিয়ে দাঁড়াল বাড়িটার সামনে, বেশ পুরোনো কিন্তু ভাঙ্গাচোরা নয়। পুরনো দোতলা বাড়ি। ভেতরে অনেক আলো আছে। কয়েকবার দরজায় কড়া নাড়তেই এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন, বেশ লম্বা, চওড়া, সুঠাম চেহারার কিন্তু মুখটা বেশ অন্ধকারে থাকায় বয়সটা ঠিক আন্দাজ করা গেল না।
কাকে চাই”? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন
“আমি না মানে, একটা থাকার জায়গা খুঁজছিলাম, “ আশা উত্তর দিল
“এটা আপনার হোটেল বলে মনে হয় “?
ভদ্রলোক এর কথায় কিছুটা অপ্রুস্তুত হয়ে গেল আশা,” আমি কলকাতায় থাকি, এক বিশেষ দরকারে এসেছিলাম। এখন এই দুর্যোগে আটকে পড়েছি। বাড়ি যেতে পারিনি, শেষ বাসটা মিস করে ফেলেছি যদি আজ রাতটুকু থাকা যেত, জানি আপনার খুব অসুবিধা হবে, তাছাড়া,….”
মাঝপথে আশাকে থামিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “ভিতরে আসুন”
ভদ্রলোক এর মুখটা এখন পরিস্কার দেখা যাছে। দেখতে মন্দ না,বেশ সুদর্শনই বলা যেতে পারে। বয়স ২৮ বা ২৯ হবে।তার বেশি কখনই হবে না। “আমি অবিনাশ গুহ, লোকাল থানার ইনচার্জ অফিসার, কলকাতায় থাকতাম, কয়েকদিন দিন হলো এসেছি, আপনি?"
“আমি আশালতা রায়।কলকাতায় থাকি”…..এখানে একটা কাজে এসেছিলাম আর এখন এখানে আটকে পড়লাম। “
আপনার এভাবে ঝড়জল মাথায় নিয়ে বেরনো ঠিক হয় নি, এখান কার এলাকাটাও খুব একটা সুবিধের না” অবিনাশ বাবু উত্তর দিলেন।
বাড়িটা বাইরে যেমন রহস্যময় ভিতরটাও তেমনই রহস্যময়, বাইরে থেকে এত আলো কিন্তু বাড়ির ভিতরটাতে কেমন যেন চাপ চাপ অন্ধকার, কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে আসছে, শুনশান চারদিক, কি নিস্তব্ধতা গ্রাস করে আছে বাড়িটাকে.......।
বাইরের কুকুরের ডাক যেন পরিবেশটাকে আরও ভংয়কর করে তুলেছে, কেমন যেন একটা নিশুতি পুরির মতো লাগছে চারদিক।
“চা খাবেন ?" অবিনাশবাবুর প্রশ্নে চমকে উঠল আশা।
“না ধন্যবাদ, আপনি কি একাই থাকেন? আর কেউ নেই বাড়িতে? না মানে এত বড়ো বাড়ি তাই বলছি আর কি?"
“না, আমি ছাড়া কেউ থাকে না,কেউ নেই আমার, বাবা মার মারা যাবার পর এক মাসি ছিল তিনিও এখন আর থাকেন না।“…এই বলে অবিনাশবাবু ভিতরে চলে গেলেন , নিজের ঘরে। সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত ভদ্রলোকটি একটু বদমেজাজি হলেও বেশ ভালো মানুষ, আর হান্ডসামও।
“আপনি কিন্তু একেবারে ভিজে গেছেন, এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে ঠান্ডা লেগে জ্বর চলে আসবে।"
“আমার কাছে তো কোনো অতিরিক্ত পোশাক নাই….তাই কি করব বলুন?"
কিছুক্ষণ কথা বলে আবিনাশবাবু আবার তার নিজের ঘরে চলে গেলেন, বাইরে থেকে দেখে বেশ বড় মনে হয় ঘরটা। খুব বিশেষ একটা আসবাবপত্র নেই তবে একটা খাট, দুটো আলমারি তাও আবার পুরনো আমলের, আর একটা খুব সুন্দর রেডিও, হাল্কা করে গান বাজছে,….”চোখে আমার তৃষ্ণা, ও গো তৃষ্ণায় আমার বক্ষ জুড়ে,। “…
কিছুক্ষনের মধ্যেই অবিনাশবাবু ফিরে এলেন। হাতে একটা লাল তাঁতের শাড়ী, “আপনি এটা পরতে পারেন, এভাবে ভিজে পোশাক এ থাকা ঠিক না।"
অবাক হয়ে আশা বলল,” এটা কার? এতো কিছুর প্রয়োজন ছিলনা কিন্তু।আপনি শুধু শুধুই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছেন।"
“শাড়ী তো আর আমি নিশ্চয়ই পরিনা,” একটা মুচকি হেসে জবাব দিলেন অবিনাশবাবু। একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাসলেন তারপর আবিনাশবাবু বললেন,” পাশের ঘরে আপনি আজকের রাতটা থাকবেন, আমার ঘরের পাশেই, কোনো অসুবিধা হবে না, যান চেঞ্জ করে আসুন তারপর খাওয়াদাওয়া হবে, আর হ্যাঁ! কথায় কথায় বলা হয়নি যে, শাড়ীটা আসলে আমার স্ত্রী মোহনার।”
অবিনাশবাবুর কথায় বেশ আশ্চর্য হল আশা।
কিন্তু একটা স্বাভাবিক হাসি দিয়ে চলে এল নিজের ঘরে। ঘরখানা বেশ বড়ো, অল্প আসবাবপত্র তাও আবার পুরোনো তবে একটা খুব আশ্চর্য ব্যাপার যে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি, একজন মহিলার। বেশ সুন্দর ছবিটা।
“মিস রায়, আপনি কি রেডি? আমি ডাইনিং টেবিলে অপেক্ষা করছি।ডিনার কিন্তু রেডি।"
অবিনাশবাবুর কথায় চমকে উঠল আশা। ও কতক্ষন যে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে ও নিজেই বুঝতে পারেনি।কৌতূহল সামলে রাখতে না পেরে ও জিজ্ঞাসা করে ফেলে,
“আচ্ছা একটা কথা বলতে পারি? ঘরে একটা ছবি দেখলাম ওটা কার?”
অবিনাশবাবু বললেন,”আমার স্ত্রী মোহনার, আজ দুবছর হল ও মারা গেছে, অনেকেই বলে, এই বাড়িতে নাকি আমার স্ত্রীর আত্মা আছে।ওর আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায়।"
"আছে নাকি?” জিজ্ঞেস করল আশা।
“থাকলে অন্ততঃ আমি তো জানতে পারতাম “ অবিনাশবাবু বললেন।
(২)
এখন রাত ২.৪৫, আশার ঘুম আসছে না কিছুতেই। একদৃষ্টিতে ও তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। হঠাৎ যেন ছবি টা ওর দিকে চেয়ে হেসে উঠল, না আর শুতে পারছি না একটু বাইরে যাই। ঠিক তার পরের মুহূর্তেই সশব্দে অবিনাশের ঘরের ভেজানো দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে যায় এক ছায়ামূতি। আরামকেদারায় গা এলিয়ে রঙিন পানিয়ের কাঁচের গ্লাসটা হাতে নিয়ে যেন কার জন্য অপেক্ষা করছিল অবিনাশবাবু।”কে মিস রায়?....কে কে ওখানে? মোহনা?” অবিনাশবাবুর গলাটা শুকিয়ে এলো, ঘামে ভিজে সাদা পাঞ্জাবী একাকার,শরীর দিয়ে রক্তের মত অফুরন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘাম ঝরছে। বাইরে আবার প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল। জোরে এক ঝাপটায় ঘরের জানালাটা খুলে গেল, বজ্রপাতের আলোয় এবার পরিস্কার দেখা গেল মোহনার মুখটা, অবিনাশবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “না না না এটা হতে পারে না, তুমি মোহনা নও… কে তুমি বলো? কে তুমি?"
“যাকে এতো গুলো দিন নিজের স্ত্রী বলে লোকের কাছে পরিচয় দিলে তাকে আজ চিনতেই পারছ না? মনে পড়ে অবিনাশ সেই রাতের কথা অজয় নাইট শিফটে ছিল তুমিই পাঠিয়েছিলে। এইরকমই এক বাদলের রাতে তুমি নিজের পাশবিক শক্তির ব্যবহার করে আমায় তুলে আনলে, নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়ে আনলে এখানে। তারপর শুরু হল তোমার চাহিদা পূরণের জন্য অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। আর যেদিন তোমার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য পালানোর চেস্টা করলাম…… সব শেষ করে দিলে ওই মাথায় আঘাত করে। কী ভীষণ যন্ত্রণা। ওই তো ফ্লাওয়ার ভাসটা। ওটা দিয়েই তো….. “
“না চুপ করো মোহনা , আমি তোমায় খুন করতে চাইনি আবেগের বশে,মদের নেশায় সেদিন.. মাফ করে দাও মোহনা”..ডুকরে কেঁদে উঠলো অবিনাশ”
আকাশ ভাঙা একটা শব্দে বজ্র-বিদ্যুৎ খেলে গেল ঘরের মধ্যে, মোহনার অট্টহাসি তে গোটা বাড়ি কেঁপে উঠল । অবিনাশ এর বুক থেকে অঝোরে রক্ত বেরতে থাকল, কষ্টে প্রাণটা বেরিয়ে গেল অবিনাশের। পাশের ঘর থেকে চিৎকার শোনা গেল আশার, মোহনার লাল শাড়ী পরে, খোলা চুলে সে এখন বন্দি ফটোফ্রেমে, ঠিক মোহনার জায়গায়। মোহনার মুক্তির জন্য এক নতুন প্রাণের যে প্রয়োজন। ছিল। মেঝেতে পরে থাকা রক্ত চেঁটে শেষ করে ফেলে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল মোহনা। সে এখন মুক্ত, অন্যদিকে আশা চিৎকার করতে থাকল,একটু মুক্তির জন্য ফটোফ্রেম থেকে। অবিনাশ এর ঘর থেকে আবার ভেসে এল “চোখে আমার তৃষ্ণা,… ও গো তৃষ্ণায় আমার বক্ষ জুড়ে “……….।
● লেখা পাঠানা:- +91 6289 281 406
● ফেসবুক গ্রুপ:- https://www.facebook.com/groups/851998065527743/?ref=share


