ভট্ট দার স্বপ্নভঙ্গ
অমিতাভ ঘোষ
স্কুল কলেজ মানেই অনেকের প্রেমের শুরু। অনেকের শুরু হবো হবো করে হয়না।আবার অনেকের জীবনে এত জনকে ভালো লেগে যায় কাকে যে বলবে মনের কথা কনফিউজড হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ সাইলেন্ট লাভার হয়ে থেকে যায় কাউকে বলতে পারে না। বোঝা ও যায় না মনের কথা।খুব চাপা স্বভাবের হয়। কিন্তু আমরা তখনই বুঝতে পারি যখন তার পছন্দের মেয়েটি বা ছেলেটি অন্য কারো সাথে এনগেজড হয়ে যায়। কলেজ লাইফের প্রেম মানে বেশির ভাগই made in চায়না টাইপের। খুব কম সংখ্যক প্রেম পরিণতি পায়। বাকি গুলো লেক,ভিক্টোরিয়া,সিনেমাহল, এগরোল, ফুচকা,আইস্ক্রিম পর্যন্ত হয়ে তার পর বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। ছেলেরা কেউ কেউ দেবদাস হয়ে পাশে, কেউ কেউ সিগারেট খাওয়া শুরু করে, কেউ বা সুরার বোতলের মধ্যে হারানো প্রেম খুঁজতে থাকে। কেউ কেউ কবিতা লেখে। আশে পাশে গেলে সেই বিরহের কবিতা শোনায়। হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারিনা। আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের একটা অদ্ভুত থিওরি ছিলো মেয়েদের। সিনিয়রদের রেগিং থেকে রক্ষা পাওয়ার সহজ এবং কার্যকর উপায় কোনো এক সিনিয়র দাদার সাথে একটু ভাব জমাতে হবে। সেই দাদাই হবে তার রক্ষা কবচ। দাদার কথা ভেবে আমরা ছোটো ছোটো কিউট ভাইরা ও কিছু ভাবতে বা করতে পারি না। মনে মনে দুঃখ থাকলেও কাল্পনিক প্রেমিকাকে বৌদি ভাবতে হতো। মনের দুঃখ রাখি কোন পকেটে!
অবশ্য মনের তৃপ্তি তখনই আসতো যখন ওই সব সুন্দরী মেয়ে গুলো সেকেন্ড ইয়ারে চলে আসতো।তখন মায়ার বাঁধন কেটে বৌদি গুলো সব দাদাগুলোকে চৈত্রের সেলের মত ছেড়ে দেয় মার্কেটে। কিন্তু ততক্ষণে দাদারা লাল নীল হলুদ সবুজ কত রঙের স্বপ্ন দেখে ফেলেছে। সব স্বপ্ন মিলিয়ে যায় বাতাসে।অনেকে ভুলে যায় সেই স্বপ্ন মিলিয়ে যাওয়ার কষ্টগুলো। কিন্তু আমার প্রিয় ভট্ট দা এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলো মন থেকে যে তিন দিন ধরে মেসে ক্যারাম খেলা বন্ধ করে দিয়েছিলো। আমরা বিড়ি চাইলে আমাদের মুখের ওপর না বলে দিতো। এই পরিবর্তন আমার মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।প্রচন্ড অন্ধকারে আশার এক মাত্র কিরণ জ্বলন্ত বিড়ি ছাড়া আর ভট্ট দাকে আমরা ভাবতে পারছিলাম না। ভট্ট দার মুখের দিকে আর তাকাতে পারছিলাম না। কি বলে যে সান্ত্বনা দেবো বুঝতে পারছিলাম না। ভট্ট দা নিজে আমাকে বললো " অমিত তুই একবার চম্পাকে ফোন করে বলে দে কাল আমি ওর সাথে শেষ দেখা করতে চাই। আমার অনেক কিছু বলার আছে । আমাকে একটা সুযোগ যেনো দেয় চম্পা। আমি মনের কথা গুলো বলে হালকা হতে চাই।প্লিজ ভাই অমিত একটি বার ফোন কর ওকে!"
আমি হনুমান ভক্ত রামের মত দাদার আদেশ পালন করার জন্য ফোন করে বললাম, "আজ ভট্ট দা খুব ভেঙে পড়েছে। তোমাকে আজ শেষ বারের মত জীবন বিজ্ঞানের প্রাকটিক্যাল বোঝানোর জন্য ভিক্টোরিয়ার সামনে আসতে বলেছে। চলে এসো চম্পা।আজ অভিমানের দিন নয়।আজ শুধু ভালবাসার দিন।"
চম্পা এসেছে। ভট্ট দার সাথে আমি গিয়েছি ভট্ট দার প্রেম জোড়া লাগাতে ।জুড়ে গেলে ভালো না হলে আমি নিজে জুড়ে যাবো। কিন্তু চম্পাকে কিছুতেই একা হতে দেবো না। কিন্তু আমার সব উপপাদ্যের থিওরি কে ধুলিস্যাৎ করে দিয়ে ভট্ট দা এমন একটা ডায়লগ দিলো আমি ভাবতেই পারিনি।
চম্পা অন্য দিকে তাকিয়ে বললো " সময় নেই আমার তোমার জন্য যা বলার তাড়া তাড়ি বলো!"
ভট্ট দা সাবলীল দীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলো " চম্পা তুমি আমার জীবনে প্রদীপ হয়ে এসেছিলে আজ দু বছর প্রেম করার পর এখন তুমি আমার ফিউজ কেটে দিয়ে চলে যাচ্ছো ? আমি কিছুতেই মেনে নেবো না।তুমি শুধু আমার ।যাওয়ার আগে ফিরিয়ে দাও আমার ১৭৪২ টাকা ।"
আমি ও চম্পা দুজনেই এক সাথে বললাম " ১৭৪২ টাকা?"
ভট্ট দা রোম্যান্টিক সুরে জানালো " হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। ফাস্ট ইয়ারের পর থেকে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠা পর্যন্ত তোমার আমার ঘোরা ঘুরি, পার্কের টিকিট,সিনেমার টিকিট,এখানে ওখানে খাওয়া বাবদ ৩৪ ৮৪ টাকা খরচ হয়েছে। তুমি এখন ব্যবসা ছেড়ে চলে যাচ্ছো তাই তোমার জন্য করা ইনভেস্টমেন্ট আমাকে দিয়ে তবেই লাভ স্টোরি শেষ হবে। তোমার ভাগে ১৭৪২ টাকা পড়েছে।দাও কিসে দেবে? ফোন পে না পে টি এম?"
কি বলবো আপনাদের ! আমার কাছে যদি অলিম্পিক কমিটির কারো সাথে যোগাযোগ থাকতো, চম্পার নামটা দিয়ে দিতাম।কি দ্রুত বেগে মিলিয়ে গেলো আমি চোখের পলক ফেলার অনেক আগেই।না !আর চম্পাকে মনের কথা বলা হলো না! মনের দুঃখ রাখি কোন পকেটে?


