মায়াপুর ভ্রমণ
দিপালী মজুমদার
বাঙালী মাত্রই ভ্রমণপিপাসু।যদি কেউ বেড়ানোর গল্প শুরু করে তাহলেত কথাই নেই। চলবে জোর আলোচনা।
যাই হোক এরকম ই একটা সুন্দর ছোট্ট ভ্রমণের কাহিনী শোনাব।
আপনারা জানেন কিনা জানিনা মিলেনিয়াম পার্ক থেকে মায়াপুর লঞ্চ সার্ভিস চালু হয়েছে। জলপথে ভ্রমণ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।আমার ভ্রমণের কাহিনী হল তৃতীয় লঞ্চ ট্রিপ। অনলাইন বুকিং করা যায়।গ্রুপ এও করা যায় আবার পার্সোনাল করা যায়।আমাদের ছয় জনের আলাদাই টিকিট কেটে রুম বুকিং করাছিল।মোট আমদের আটাশ জন সিনিয়র সিটিজেন এর গ্রুপ ছিল।
১৮ জুলাই সকাল দশটায় মিলেনিয়াম পার্ক এ জমা হলাম।শিপিং কর্পোরেশনের অফিসের উল্টোদিকে যে জেটি সেখান থেকেই লঞ্চ ছাড়বে।সকলেই খুব উত্তেজিত। বেলা এগারোটার সময় লঞ্চ ছাড়ার কথা।যথাসময়ে সকলেই উপস্থিত এবং ছেড়েও দিল।তারপর চা এর সাথে কিছু স্নাকস্ সরবরাহ করা হল।তারপর বেশ ফ্রেশ লাগার পর অনেকেই ছাদে চলে গেলাম। বর্ষাকাল হলে কি হবে বর্ষার কোনও দেখা নেই। তবে আবহাওয়া খুব সুন্দর,হালকা মেঘ, ফুরফুরে হাওয়ায় মন উতলা।বেলুড় মঠ, দক্ষিণেশ্বর এর মন্দির এক এক করে পিছনে ফেলে গঙ্গার দুইধারের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চলা, তারই মাঝে মাঝে ফটোস্যুট্।সেই ছোটোবেলায় ফিরে যাওয়া এক অনাবিল আনন্দে
মন ভরপুর। কোথাও ছেলেরা নৌকা থেকে গঙ্গায় ঝাপাচ্ছে,কোথাও জেলেরা জাল পেতে নৌকাতে অপেক্ষমান। এইভাবে নৈহাটী টিটাগড় সব পেরিয়ে গুপ্তিপাড়া এসে লঞ্চ থামল।এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলা হয়নি,লঞ্চের একটা পোর্শন এয়ারকণ্ডিশন ছিল। অনেকেই সেখানে বিশ্রাম করছিল।
গুপ্তিপাড়া এসে আমাদের একটা বিশালাকৃতি লঞ্চের মধ্যে নিয়ে গেল। সেই টা হোমস্টে লঞ্চ,এইবার সেখানে আমাদের রুম নাম্বার দিয়ে দিয়েছিল,সেইমত সবাই সেখানে গেলাম ,দেখে তো অবাক হলাম,অসাধারণঘর,মন ভরে গেল। ওখানে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের অসাধারণ খাওয়া,গল্প,প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে সেই সময় সমাগত।সুর্যদেব এর অস্ত যাওয়ার পালা।রক্তিম আভায় সমগ্র আকাশ রক্তমিত।সে যে কী অপরূপ সৌন্দর্য তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।মনের মণিকোঠায় থেকে গেল।আর থাকল মোবাইল বন্দী সেই অসাধারণ মুহূর্ত গুলি।জীবনে অনেক মুহূর্ত আসে যেগুলি কোনোদিন ই ভুলবার নয়।গুপ্তিপাড়া থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য কখনোই ভুলব না।এর পরেই আমাদের টোটো করে গুপ্তিপাড়া ঘুরিয়ে দেখাল।সন্ধ্যা হয়ে গেছে তখন অনেক মন্দির বন্ধ হয়ে গেছে।তার মধ্যেই জগন্নাথের মাসীর বাড়ি,স্নানযাত্রার জায়গা,যেখানে মেলা বসে,তখনও মেলা চলছিল,টেরেকোটা কাজের বিষ্ণুমন্দির,রথ একপাশে অনেক কিছুই দেখা হল।ওখানকার মিষ্টি এবং ঘি খুব বিখ্যাত। অনেকেই সংগ্রহ করলেন। তারপর ভেসেলে ফিরে সান্ধ্যকালীন এলাহী টিফিন সেইসাথে সুস্বাদু চা পান করে অদম্য এনার্জী নিয়ে নাচগান শুরু হল।তখন সবাই স্যুইট সিক্সটিন এ পৌঁছে গেলাম। কোথায় কার ব্যথা আর মনে পড়ল না।সত্যিই এক স্বর্গীয় মুহূর্তের সাক্ষী থাকলাম।
এত টিফিন দেরীতে খাওয়ার পরেও নৈশভোজে দারুণ উপভোগ্য খাদ্য,সকলেই মনের খুশীতে ডিনার সেরে যে যার এসি রুমে শুয়ে সুন্দর নিদ্রাযাপন।
এক ঘুমেই ভোর হতেই দৌড়ে বাহিরে চলে এলাম সুর্যদেবের সাক্ষাত এর জন্য। মেঘলা থাকাতে একটু পরেই দৃশ্যমান হলেন।তার মধ্যেই মোবাইল বন্দী থাকল অপূর্ব সেই সব মুহূর্ত। জীবনে প্রথমবার জলের মধ্যে রাত্রিযাপন করলাম। এও এক অভিনব অভিজ্ঞতা হল।
কিছুপরেই সবাই রেডি হয়ে পূর্বের সেই লঞ্চ করে মায়াপুর যাত্রা এবং জলখাবার সহ চা পান করে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে বেলা এগারোটাতে কাঙ্খিত মায়াপুর এসে পৌঁছালাম। নানারকম নিয়ম কানুন পালন করে মুল মন্দির এ বেলা বারোটাতে পৌঁছালাম ।আরতি দেখলাম। প্রচুর হরেকৃষ্ণ সহযোগে নাচ।মন তখন শ্রীকৃষ্ণের চরণে সমর্পিত।
তারপর ওখান থেকে ডাইনিং হলে সুসজ্জিত রুমে চেয়ার টেবিলে বসে বাতানুকুল ঘরে শ্রীকৃষ্ণের অমৃতময় ভোগ খাওয়া সমাপন এবং কিছু বক্তৃতা শুনে বেলা তিনটের মধ্যে লঞ্চে উঠে পড়া। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেই পড়ন্ত বিকেলে সুর্যের অস্তরাগ এ রক্তিম আকাশ দেখতে দেখতে ফিরে আসা,সবুজ দ্বীপ,শিবমন্দির আরও অনেক অনেক কিছু যে গুলি লিখে বলা যাবে না।নিজের চোখে না দেখলে বলা যাবে না।।অবশেষে রাত নয়টায় মিলেনিয়াম পার্ক পৌঁছে দিল।
একটি সুন্দর মনোরম ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে খুব গর্বিত মনে করলাম।


