শিরোনাম: ☆ আবার নতুন করে ☆
লিখেছেন: ◇ দীপক কুমার মাইতি ◇
নির্জন পার্কে অংশুমালী একাই বসে আছে। একটু দূরে দু’জন লোক একটি বেঞ্চে আধ শোয়া অবস্থায় ঘুমোচ্ছে। দেখে মনে হয় শ্রমিক শ্রেণির লোক। সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত । একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। মনে মনে হাসে অংশুমালী। তখন সে বাড়ি বাড়ি টিউশিনি করত। একটা বাড়িতে টিউশিনি শেষ করে পরের বাড়িতে যাওয়ার সময় এই পার্কে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিত। সেই অর্থে সেও তখন শ্রমিকই ছিল। এখানেই একদিন গার্গীর সাথে আলাপ হয়েছিল। গার্গীও বাড়ি বাড়ি টিউশিনি করত। সেও এখানে বিশ্রাম নিত। দেখেছে দু একবার। কিন্তু কোনোদিন কথা হয়নি। এক গ্রীষ্মের দুপুরে অংশুমালী বসে। খুব তেষ্টা পায়। ব্যগ থেকে বোতল বের করে গলায় জল ঢালছিল। গার্গী সামনে এসে দাঁড়ায় — একটু জল পেতে পারি? আমারটা ফেলে এসেছি।
আলাপ শুরু সেই থেকে। প্রথম প্রথম চাকরির নিয়েই কথা হত। দুজনে মিলে একটা empoleyment News পত্রিকা কিনত। তার থেকে বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত করত। পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতেই ঘড়ি দেখে অংশুমালী। তিনটে বাজে। শিতের দিনে বেলা তো গড়িয়ে এল। কিন্তু গর্গীর দেখা নেই। ও তো কোনদিন দেরি করে না! তবে কী অসুস্থ! একবার যাবে নাকি দেখতে! কিছুক্ষণ ভাবে সে। উঠে দাঁড়ায়। দেখে, গর্গী গেট দিয়ে হনহনিয়ে ঢুকছে। ওকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। অংশুমালী ভাবে, শরীর ভালো নেই তো এল কেন? ওকে ডাকলেই তো চলে যেতে পারত! গার্গী সামনে এসে দাঁড়ায়। আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মোছে। অবাক হয় অংশুমালী – এই শীতেও মুখে ঘাম! তোমার কী শরীর খারাপ! তা এলে কেন?
হাসে গার্গী – কী করি। তোমার ডাক কখনও সাড়া না দিয়ে থাকতে পেরেছি? দেরি হয়ে গেছে। তাই তাড়াতাড়ি মানে প্রায় দৌড়ে এসেছি।
তা দেরি হল কেন?
আর বলবে না। বিতানের স্কুলবাস দেরি করে ফিরল। ওকে খাবার দিলাম। তারপর এঁটো বাসন ধুয়ে বেরালাম।
রেগে ওঠে অংশুমালী – কেন ওর মা কী ঘুমাচ্ছে? তুমি কী ওদের কাজের মেয়ে! তুমি তো চিরকাল দুই ছেলে স্কুল থেকে ফিরলে খেতে দিতে। তারপর বিশ্রাম নিতে। তিনি পারেন না?
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে গর্গরির মুখ থেকে – এটাই ভালো গো। ভবিষ্যতে আমার মত কষ্ট পাবে না। এখনও দুপুরে ভাবি ওরা ঠিক করে খেল কিনা। অফিস থেকে ফিরলে ওরা আর আমার কাছে খেতে চায় না। নিজেরাই নিয়ে নেয়। নয়ত না খেয়ে থাকে। নিজের থেকে কিছু করতে গেলে যদি অশান্তি হয়! বুকে পাথর চেপে থাকতে হয়।
অংশুমালীর পাশে বসে গর্গরি। দুজনে চুপ করে সামনের দিকে তাকিয়ে। গার্গী বুঝতে পারে অংশুমালী রাগে ফুঁসছে। কথা ঘুরাতে সে বলে — কাল ভ্যালেন্টাইনস ডে। আজকে ডাকলে কেন?
অংশুমালী হেসে তার দিকে তাকায় — কাল তো নবীন-নবীনাদের ভিড় হবে। মনে আছে গতবার নতুন প্রেমিক প্রেমিকারা আমাদের দেখে হাসাহাসি করছিল। বাঁকা মন্তব্য হজম করতে হয়েছিল।
গার্গী আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে – জান, কাল হিসাব করছিলাম। আমাদের বিয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হল। তাই না?
অংশুমালী গার্গীর হাত শক্ত করে ধরে – ঠিক তাই। মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। মনে আছে, আমাদের একমাস আগে বিপিনের বিয়ে হয়েছিল। ওর ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের গোল্ডেন জুবলি বিবাহ বার্ষিকি ধুমধাম করে পালন করল। আমায় ডেকেছিল। যেতে মন চাইল না।
বিপিনদা আমাকেও ডাকতে এসেছিল। শরীরের অজুহাতে যেতে পারব না বলেছিলাম।
কিছু না বলে অংশুমালী ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকে এক অসহ্য কষ্ট অনুভব করে। অংশুমালীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে গার্গী গাঢ়স্বরে বলে — ঘর বাঁধবো বলে এক ভ্যালেনটাইনস ডে তে আমরা বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম।তারপর কেটে গেল এতদিন। ভাবতে পার!
অংশুমালী ডুব দেয় অতীতের অতলে। সালটা ১৯৭২। তখন সবে একটা স্কুলে শিক্ষক হিসাবে জয়েন করেছে। তখন স্কুল মাস্টার পাত্র হিসাবে অচল। বেতন কম। প্রতি মাসে বেতন মেলে না। তার উপর গার্গীরা বাহ্মণ। ওরা কায়স্থ। গার্গীর বাবা ভয়াঙ্কর গোঁড়া। ওদের কথা জানতে পেরে ভীষণ রেগে যান। গার্গীর বাবা এক বড়লোক ব্যবসায়ীর সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন। সেদিনও ছিল ভ্যালেনটাযন ডে। দেখা করতে এসে গার্গী খুব কান্নাকাটি করছিল। গার্গীর হাত ধরে বলেছিল – চল আজই তোমায় বিয়ে করব। তুমি রাজি!
কোন কিছু না ভেবে দুজনে সেদিন ঘর ছেড়েছিল। মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেছিল। অনেক ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল। বিন্ধুদের সহায়তায় সব হাসি মুখে দূর করেছিল। আংশুমালী ভাবে এই তো সেদিনের কথা। দেখতে দেখতে যে পঞ্চাশ বছর গড়িয়ে গেছে ভাবতে পারে না। অংশুমালী গার্গীর হাত নাড়াচাড়া করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ছাডে়। পকেট থেকে একটা কাগজের মোড়ক বার করে গার্গীকে দেয় । গার্গী মোড়ক খুলে আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠে — ই—লি-শ-মা-ছ ভাজা ! ক-ত-দি-ন পরে খাব! কোথায় পেলে?
আজ সকালে অরিসূধন ইলিশমাছ এনেছিল। রান্নার মেয়েকে বলেছিলাম, আমার জন্য মাছের ভাজা করতে। নিজে না খেয়ে তোমার জন্য এনেছি।
অবাক দৃষ্টিতে অংশুমালীর দিকে তাকায় গার্গী – তুমি কী খেলে? শুধুই ভাত খেলে!
কেন শুধু ভাত! ডাল ছিল। বাঁধা কফির তরকারি ছিল। ইলিশ মাছ তুমি খাবে না আর আমি খাব! কোনদিন হয়েছে। বাজারে গেছি ইলিশ মাছ উঠেছে না কিনে ফিরেছি কখনো?
গর্গরির মনে পড়ে, একবার স্কুলের এডুকেশন এক্সকার্শনে অংশুমালী দীঘা গিয়েছিল। ফেরার পথে ইলিশ কিনে বেশ রাতে বাড়ি ফিরেছিল। রাতেই অংশুমালী নিজে মাছ কেটে মাছের ঝোল রান্না করেছিল। তাকে রাতে খেতে বাধ্য করেছিল। সেদিনের কথা ভেবে হাসে। সে মাছ ভাজায় পরম তৃপ্তিতে কামড় দেয়। অংশুমালী তৃপ্তির হাসি হাসে — সামনের মাসেই আমাদের তো ঠাঁই বদল হবে। অবিনাশের বাড়িতে কাঁটা মাছ বলে ইলিশ ঢোকে না। অরিসূধন তোমার মত ইলিশ-প্রেমিক।
আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে গর্গরি – জানো আজও রাস্তায় যখন হাঁটি মনে হয় দুপাশে অরিসূধন ও অবিনাশ হাঁটছে। তখন লোকে তাই নিয়ে কত হাসাহাসি করত। অথচ আজ পাশে থেকেও কতদূরে।
অংশুমালী দেখে ওর চোখ জল। তাড়াতাড়ি রুমাল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দেয় — আমার নামের সাথে মিলিয়ে দুই ছেলের নাম রেখেছিলে অরিসূধন ও অবিনাশ। কৃষ্ণ আর শিবের কোথাও সহ অবস্থান দেখেছো? এই তো ভালো ছ'মাস অরিসূধন ও ছ'মাস অবিনাশকে পাচ্ছো।
গার্গী অংশুমালীর হাত জড়িয়ে ধরে। তার আবেগ মথিত কণ্ঠস্বর — অংশুমালী ছাড়া আমার জীবন তমসাময়। বুঝতে পার না? না বুঝতে চাও না! তোমাকে ছেড়ে একা একা ভালোলাগে না। সে তুমি বুঝবে না।
গাঢ়স্বরে অংশুমালীর – বুঝি বুঝি। যৌবনে যৌনতা, প্রৌঢ়ত্বে খুনসুটি আর বার্ধক্যে পরস্পরের অবলম্বন হওয়াই তো বিবাহের স্বার্থকতা। এই আপ্ত বাক্য ভুলি কী করে?
আকুতির কন্ঠস্বর গার্গীর — পারো না আর একবার আমায় নিয়ে পালিয়ে যেতে?
অংশুমালি হাসে –পারি। পারি। বাবা-মায়ের মায়া একদিন ত্যাগ করতে পেরেছিলে। কিন্তু আজকে যে তুমি মায়ার বাঁধনে তুমি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। ছেলে, নাতি নাতনি ও সংসারের মায়া তুমি কী ত্যাগ করতে পারবে?
গার্গীর দৃঢ় ভাবে অংশুমালীর হাত চেপে ধরে— তুমিই আমার প্রকৃত মায়া। তোমার ডাকে সব মায়া চিরকাল ত্যাগ করেছি। আজও পারব, পারব, পারব।
অংশুমালী উঠে দাঁড়ায়। হাত টেনে তুলতে চায় গর্গরিকে —তবে চল। আর একবার বেরিয়ে পড়ি।
অবাক দৃষ্টিতে গার্গী তাকায় তার দিকে – কোথায়? এখুনি?
সেদিন তোমার বিয়ের কথা শুনে এমনি ভাবে তোমার হাত ধরে বলেছিলাম, ‘চল আজই বিয়ে করব।’ মনে আছে? আর্থিক অশক্ত আমার হাত ধরে বাড়ি ছাড়তে সেদিন কোন প্রশ্ন করনি। আজ কেন মনে প্রশ্ন জাগছে? আমার অশক্ত শরীর বলে?
গার্গী অংশুমালীর হাত শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়ায়। দুজনে একবারও পিছন না ফিরে এগিয়ে চলে। অস্তগামী সূর্যে রশ্মিতে তাদের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম হতে হতে এক সময় মিলিয়ে যায়।
● লেখা পাঠানা:-
+91 6289 281 406
● ফেসবুক গ্রুপ:- https://www.facebook.com/groups/851998065527743/?ref=share


