শিরোনাম: ☆ গল্পের শেষে ☆
লিখেছেন: ◇ অমিতাভ ঘোষ ◇
ভোর বেলায় যখন ফোনটা এলো প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না স্বপন আর নেই এই পৃথিবীতে।এমন কি হয়েছিলো যে এই ভাবে চলে যেতে হবে সব মায়ার বাঁধন কাটিয়ে? এতো ভালো চাকরী,বাড়ি ,গাড়ি কি ছিলো না ওর! হঠাৎ করে এই চলে যাওয়াটা কিছুতে মেনে নিতে পারছি না।অফিসে ফোন করে জানিয়ে দিলাম যে আজ আর আসতে পারবো না।বিষ্ণুপুর মহা শ্বশানে শেষ কাজ সম্পন্ন হলো।ওর স্ত্রী রূপা আমার পরিচিত।ওদের লাভ ম্যারেজ । আমিই ওদের প্রেমের শুরু থেকে ছিলাম এবং হঠাৎ করেই প্রেমের শেষ মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেলাম। কথা বলার মত অবস্থায় আমরা কেউ ছিলাম না।রুপাকে বলে এলাম কোনো কিছু প্রয়োজন হলে যেনো ফোন করে আমাকে।না ,ফোন আর করে নি রূপা আমাকে।কয়েক দিনের মধ্যেই শ্যাম পুকুরের বাড়ি জমি বিক্রি করে দিয়ে সোনারপুরের কাছে একটা ফ্ল্যাটে ছেলেকে নিয়ে চলে যায় রূপা।আমি দেখা করতে গিয়ে জানতে পারি ওরা চলে গেছে।আগের নম্বরটা আর নেই।এখন কার নম্বরটা ও কেউ জানে না।একটু খারাপ লাগলো বিষয়টা। এতো ক্লোজ বন্ধু ছিলাম আমরা আজ স্বপন চলে যাওয়ার পরে এতো তাড়াতাড়ি সব যোগাযোগ শেষ হয়ে গেলো! ছেলেটাকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো।ওর মুখটা প্রায় অনেকটা স্বপনের ই মতো।
তিন দিন আগে ডায়মন্ড হারবার পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম একটা কাজের জন্য।গত কাল বিকালে বাড়িতে ছিলাম না।একটা পার্সেল আসে ।নাম লেখা-- মোহন দাস।ঠিকানাটা আমারই দেওয়া।আমাকে পার্সেল করতে পারে এমন কেউ তো নেই! তাই ফেরৎ দিতে এসেছিলাম।দেখা হয়ে গেলো স্বপনের অফিসের এক বন্ধুর সাথে।ভদ্রলোকের নাম অরূপ সেন।
আমি বললাম " চিনতে পারছেন?"
--- হ্যাঁ হ্যাঁ।আপনি স্বপনের বন্ধু তো? দু এক বার এসেছিলেন অফিসে তাই না?
--- হ্যাঁ।কেমন আছেন?
--- ভালো আছি।আপনি?
--- এই চলে যাচ্ছে কোনো রকমে।পোস্ট অফিসে কোনো কাজ ছিলো?
---- হ্যাঁ।কয়েকটা জিনিস পাঠাতে হবে ছেলের কাছে দিল্লিতে। আপনার কোনো কাজ ছিলো?
আমি সব কিছু খুলে বললাম ওনাকে।উনি বললেন " আপনি খোলেন নি পার্সেল টা?"
--- না না।কে পাঠিয়েছে তার কোনো ঠিক নেই।নামটাই তো ভুল।ভুল করে হয়তো অন্য কেউ আমার ঠিকানা বসিয়ে দিয়েছেন ,খেয়াল করেন নি।
--- আপনার কাছে যখন এসেছে, একবার খুলে দেখতে পারতেন।তারপর ফেরৎ দিতেন।হতে পারে আপনারই পরিচিত কেউ..... । ঠিক আছে আমি আসি তাহলে।আবার দেখা হবে।কিছু মনে করবেন না একটু ব্যস্ত আছি আজ।
--- না না অবশ্যই ।আবার দেখা হবে।ভালো থাকবেন।
--- আপনিও ভালো থাকবেন।
উনি চলে গেলেন ।একটু দূরে গিয়ে উনি একটি টোটো তে করে বেরিয়ে গেলেন।আমি ভাবছিলাম কি করবো? পার্সেল টা খুলে একবার দেখবো? রিসিভ যখন করেই ফেলেছি তাহলে আর সমস্যা কোথায়? রোহন দাসের জায়গায় ভুল করে মোহন দাস লিখে ফেলেন নি তো যিনি পাঠিয়েছেন?আচ্ছা এক কাজ করা যাক, আগে খুলে দেখি কি আছে! তারপর ভাবা যাবে।পোস্ট অফিসের পাশ দিয়ে একটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো রাস্তা নদীর ধারে গিয়ে মিশেছে।ওখানে ইদানিং বসার জন্য গাছের তলায় অনেক গুলো বেঞ্চ তৈরী করেছে পৌরসভা।ওখানে গিয়ে পার্সেল টা খুলবো।অকাজের পার্সেল হলে হুগলী নদীতে বিসর্জন দেবো।বেশ ফাঁকা পেলাম নদীর ধারে।বিকালের দিকে এখানে বেশ ভিড় হয়।কিছু দোকান বসে মশলা মুড়ি, আইস ক্রিম,ফুচকা নিয়ে।এখন অবশ্য কেউ নেই।খুলে ফেললাম পার্সেল টা।একটা ডায়রী ২০২২ সালের।ওপরে একটা চিঠি।মাননীয় ......
দুঃখিত আমি আপনার নামটা সঠিক জানি না ।ঠিকানাটা মোটা মুটি আন্দাজ করে পাঠিয়ে দিলাম আপনাকে। দয়া করে চিঠিটা পুরো পড়বেন এবং তারপর কি করবেন সেটা আপনার হাতেই ছেড়ে দিলাম।চিঠিটা আপনার বন্ধু স্বপন কে নিয়েই।আমি ওর অফিসের এক জন সহকর্মী।শুধু সহকর্মী বললে ভুল হবে,স্বপন আমার ছোটো ভাইয়ের মতো। স্বপন খুব ভালো মানুষ ছিলো।সবার সাথে খুব ভালো ভাবে মিশে যেতে পারতো।খুব হাসি খুশি ছিলো।মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে হঠাৎ করে ওর মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করি। ও খুব খিটখিটে স্বভাবের হয়ে যায়।আমাদের সাথে ভালো করে কথা বলতো না।হঠাৎ করে কাউকে কিছু না বলে অফিস কামাই করতো।বাড়িতে কোনো সমস্যা কিনা বুঝতে পারছিলাম না।এক দিন ফোন করেছিলাম বাড়ির ল্যান্ড ফোনে।ওর স্ত্রী ফোন ধরেছিলো।যে টুকু বুঝতে পারলাম ,বাড়িতেও এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে।মোটামুটি ডিভোর্সের দিকে এগোচ্ছে ওদের ব্যাপারটা।সেই থেকেই কি এই পরিবর্তন? লাভ ম্যারেজ ছিলো ওদের ! সেখান থেকে ডিভোর্স পর্যন্ত বিষয়টি কি করে এগিয়ে গেলো! এসব জিজ্ঞাসা করেও কোনো লাভ হয়নি।স্বপন কিছুতেই আমার সাথে কথা বললো না।আমার সাথেও বাজে ব্যবহার করতে শুরু করায়, আমি ওর থেকে দূরে সরে থাকি।কথা বার্তা প্রায় বন্ধ জুলাই মাস পর্যন্ত। হঠাৎ করেই স্বপন চলে যায় আমাদের সবাইকে ছেড়ে। এতো খারাপ লেগেছিলো যে আমি আর ওর শেষ কাজে যাই নি।অফিসের কয়েক জন গিয়েছিলো ভদ্রতার খাতিরে।আমি যাই নি।খুব ভালোবাসতাম ওকে।কথা বলতাম না এক রকম ছিলো,কিন্তু এখন তো আর কোনো দিনও কথা হবে না ওর সাথে।ওর অফিসের সব ফাইল গুলো চেক করার সময় হঠাৎ করেই আমার হাতে এসে পড়ে এই ডায়রিটা।সামনের দিকে কিছু লেখা ছিলো না।শেষের দিকে কয়েকটা পাতায় কিছু লেখা। খুবই অল্প লেখা কিন্তু তাতেই অনেক কিছু বলা আছে।অনুরোধ রইলো আপনার কাছে।ডায়রী টা সঠিক লোকের হাতে তুলে দেবেন।ধন্যবাদ।
ইতি.............
আর কিছু লেখা নেই ।আমি ডায়রিটা খুলে দেখলাম সত্যিই কিছুই নেই..... জুলাই মাসের ১০ তারিখে এক জায়গায় লেখা.... " চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।"
এর পর কয়েকটা পাতা কিছুই লেখা নেই।
১৭ তারিখে লেখা " খুব কষ্ট হচ্ছে।যা চেষ্টা করছি এতদিন ধরে আজ সফল হতে চলেছে।খুশি হওয়ার কথা তবুও হতে পারছি না।ডিভোর্স প্রায় কনফার্ম।অনেক কষ্ট করে রাজি করাতে পেরেছি নিজেকে।আজ রূপা আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করেছে।এক ছাদের নিচে ওকে কিছুতেই থাকতে দেওয়া চলবে না।ওদের জন্য সব কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছি।ইন্সুরেন্সের বিষয় গুলো বোঝাবার সময় পাই নি।আর বেশি দিন হাতে নেই আমার।দুটো কিডনি আমাকে ধোঁকা দিয়েছে।ইতিমধ্যে একবার ডায়ালিসিস হয়ে গেছে।আর কোনো উপায় নেই।অফিস কামাই করে ,বাড়ি তে না জানিয়ে চেষ্টা করেছিলাম ভালো হয়ে ওঠার।হতে পারিনি ! ভালো হতে পারিনি।তাই সবার কাছে খারাপ হতে চেয়েছি।সবাই যেনো আমার থেকে দূরে সরে থাকে।ঘেন্না করলে তাকে ভুলে যেতে খুব কম কষ্ট হয়।লাস্ট যেবার ট্রিটমেন্টের জন্য গিয়েছিলাম.... মা ঘুমাচ্ছিলেন আমি পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতে গিয়েও ,পা ছুঁতে পারিনি।যদি মা জেগে ওঠে! আর লুকাতে পারবো না নিজেকে।ফিরে এলে হয়তো ভালো হয়ে আসবো।তখন সবাইকে সব কিছু খুলে বলবো।আসলে আমি একাই সংসার টা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।সবার প্রত্যাশা,স্বপ্ন আমাকে ঘিরে।হঠাৎ করে যখন সবাই জানবে আমি নেই! কেউ সহ্য করতে পারবে না।অনেক কিছু ইচ্ছে ছিলো জীবনে।সব কিছু অধরা হয়ে রয়ে গেলো মনে হয়।সারাজীবন মদ, বিড়ি, সিগারেট,গাঁজা ,খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে ছিলাম।কলেজ লাইফে সবাই যখন জীবনটাকে উপভোগ করতে ব্যস্ত ছিলো,আমি জীবন গড়ার কাজে ব্যস্ত ছিলাম।ভালো চাকরী পেলে সব কিছু হবে আমার হাতের মুঠোয়! চাকরী পেলাম।রুপাকে পেলাম।বাড়ি,গাড়ি,ব্যাংক ব্যালেন্স সব কিছুই পেলাম।কিন্তু আমার শরীর আমার সঙ্গ দিলো না।মাঝে মধ্যে খুব ক্লান্ত লাগতো।কিন্তু সেটা যে চির নিদ্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। সত্যি আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম।আমার জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক ভীষণ সুন্দর ছিলো।সবাইকে নিয়ে খুব খুশি ছিলাম।নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না।এই সম্পর্ক গুলো থেকে আমি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি।কয়েক দিন আতঙ্কে স্ত্রী সন্তানের পাশে ঘুমাতে পারিনি।যদি হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে মারা যাই! ওরা কি করবে ? ওরা পারবে না মেনে নিতে!একা এসেছিলাম পৃথিবীতে ! একাই যেতে হবে! ছেলেটাকে ঠিক আমার মতোই দেখতে।সবাই যখন প্রশংসা করতো " ছেলের মুখটা পুরো বাবার মত" খুব ভালো লাগতো।দুজনে পুজোর সময় এক রঙের ম্যাচিং পাঞ্জাবি পরে ঠাকুর দেখতে যেতাম।আজ মনে হচ্ছে বাবু তুই আমার মতো হোস না।আমার যে খুব অল্প আয়ু।আমার মতো চলে যাস না সবাইকে ফেলে।আমি হেরে গেছি রে বাবা!হঠাৎ করেই হাতটা ছেড়ে দিতে হচ্ছে।ক্ষমা করিস বাবা!
রূপা ভালো থেকো। ক্ষমা করে দিও আমায়।নতুন করে শুরু করতে হবে পথ চলা।আমি চাইনি বদলে যেতে তবুও বদলে গেলাম।বোঝাতে পারলাম না যাওয়ার আগে ব্যাংক/এল আইসি/মিউচ্যুয়াল ফান্ড এর বিষয় গুলো। যত বার বোঝাতে গেছি, তুমি শুরু করতেই দাওনি।বলেছিলে " তুমি যত দিন আছো আমার শুধু তোমাকেই চাই।"
আমি যে আর নেই! তোমার সাজানো ঘরের কোনো অংশে আমি আর নেই।টিকিট কাটা হয়ে গেছে ।আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা! যমরাজ আশে পাশেই ঘোরাফেরা করছে! ফাঁকি দিতে পারলাম না। এখানেই শেষ করছি।যদি বেঁচে ফিরে আসি তাহলে আবার লিখতে পারবো হয়তো কিছু।"
এই ছিলো ডায়রীর পাতায় ।শেষের দিকে আর কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না ।চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছিলো। স্বপনের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহুর্ত আজ চোখের সামনে ভেসে আসছে।কত মানুষ এই ভাবে চলে যায় ,চলে যাওয়ার এই গল্পগুলো আমরা অনেকেই জানি না।সম্পর্ক শুরু থেকে সম্পর্কের শেষ প্রতিটা গল্প সবাই জানতে পারে না। রূপা যদি সব কিছু ভুলে গিয়ে নতুন করে শুরু করে থাকে তাহলে স্বপনের চলে যাওয়ার গল্পটা না জানলেও চলবে ।এই ডায়রী হাতে পেলে আবার মন পিছনের দিকে চলতে থাকবে।নিজেকে অপরাধী মনে হবে।তার চেয়ে গল্পের সমাপ্তি আমার কাছেই থেকে যাক।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহের লেখা একটা কবিতা আজ ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে।
"চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!
এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…"
● লেখা পাঠানা:-
+91 6289 281 406
● ফেসবুক গ্রুপ:- https://www.facebook.com/groups/851998065527743/?ref=share


