𝕾𝖆𝖆𝖍𝖎𝖙𝖎𝖐 𝕻𝖗𝖔𝖐𝖘𝖍
╔═══════ welcome ════════╗
শিরোনাম: ❀ হানিমুন ❀
লিখেছেন: ֎ রত্না দত্ত ֎
⊰᯽⊱┈──╌❊ - ❊╌──┈⊰᯽⊱
কলেজের সময় থেকে রাজীব আর শ্রেয়ার ভালোবাসা। বন্ধুত্ব টা ধীরে ধীরে কখন ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে কেউ বুঝতে পারে নি। কলেজের পর কিছুদিনের চেষ্টায় রাজীব একটা মাল্টিন্যাশন্যাল কোম্পানিতে চাকরী পেয়েছে আর শ্রেয়া একটা বেসরকারী স্কুলে চাকরী পেয়েছে। একে অপরকে ভীষণ ভালোবাসতো। রাজীব একান্নবর্তী পরিবারের ছেলে ছিল। কাকা, জ্যাঠা ওনাদের ছেলেমেয়ে নিয়ে বিশাল পরিবার। সকলে মিলেমিশেই থাকে। ওদের পরিবারের মিলমিশ দেখে ঈর্ষাকাতর প্রতিবেশীরা আড়ালে মুখ বেঁকিয়ে বলে," দেখবো , কতদিন এই মিলমিশ থাকে।" রাজীবদের পরিবারও অল্পবিস্তর প্রতিবেশীদের এই মনোভাব জানে, কিন্তু পাত্তা দেয় না। প্রতিবেশীরা এর নিন্দা ওর কাছে করে, ওদের পরিবারে ভাঙন ধরাবারও চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। যাইহোক আজকের গল্প রাজীবের পরিবারের একতা নিয়ে নয়। তাই আসল গল্পটাই শুরু করা যাক।
কলেজের সময় থেকে এখনো, রাজীব যখন শ্রেয়ার সঙ্গে দেখা করে, তখন বেশীর ভাগ সময় ওদের পরিবারের কথাই বেশী বলে। কে কেমন ? কি ভাবে একসঙ্গে হৈ হৈ করে সময় কাটায় - আরো অনেক বিষয়। শ্রেয়া প্রথম প্রথম মনে মনে একটু বিরক্ত হতো, কখনো কখনো থাকতে না পেরে বলে দিত, " তুই কি রে, কত কষ্ট করে একটু সময় বার করে আমরা দেখা করি, আর তুই এসে খালি বাড়ির গল্প করিস। আমাদের নিজেদের কি কোন কথা নেই ? শুধু তোর আর আমার ?" এই কথা শুনে রাজীব একটু থমকে যেত, ভাবতো সত্যিই তো, আমি তো কেবল বাড়ির কথাই বলি। তখন একটু নিজেদের কথা বললেও, একটু পর কোন না কোন ভাবে বাড়ির প্রসঙ্গ এলেই, আবার বাড়ির কথা বলতে শুরু করে দিত, আর শ্রেয়া মনে মনে রাগ করতো কিন্তু বুঝতে দিত না। শ্রেয়া রাজীবকে ভীষণ ভালোবাসতো। পরে নিজেই ভাবতো, রাজীব যদি ওর,পরিবারের কথা বলে খুশি থাকে, তবে থাক। ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়েছিল শ্রেয়া। ও বুঝতে পারতো রাজীব ওর পরিবারের সকলকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই আর কিছু বলতো না, উল্টে ও মজা নিত আর নিজে থেকেই সকলের কথা জিজ্ঞেস করতো, এতে রাজীব আরো বেশী উৎসাহের সঙ্গে নিজের পরিবারের কথা বলতো। যাবার সময় শ্রেয়া রাজীবের চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলতো, " এইভাবেই সকলকে নিয়ে সবসময় সুখী থাকিস।" রাজীব একটা তৃপ্তির হাসি হাসতো।
রাজীব এবার থিতু হতে চায়, অবশ্য এটা আগে ওর বাড়ির দিক থেকেই কথা উঠেছে। তারপর ওর মনে হলো শ্রেয়াকে বাড়ির সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। রাজীবের পছন্দ ওদের পরিবারের সকলে খুশী মনে মেনে নিয়েছে। পরিচয় হবার পর শ্রেয়া মাঝে মাঝেই রাজীবের সঙ্গে ওদের বাড়ি যেত। কয়েকবার যাবার পর শ্রেয়া বুঝলো, কেন রাজীব ওর পরিবারকে ভালোবাসে!! শ্রেয়াও ধীরে ধীরে সকলের কাছে সহজ হয়ে গেল, সকলের জন্য ওরও মনে ভালোবাসার জায়গা তৈরী হয়ে গেল। আসলে রাজীবের পরিবারের সকলেই খুব প্রাণখোলা ছিল। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে ওরা সবাই একসঙ্গে সারাদিনের জন্য কোথাও না কোথাও ঘুরতে বেড়িয়ে যেত। আর সঙ্গে শ্রেয়াকেও নিত। শ্রেয়া বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। শ্রেয়ার বাবা-মা যখন রাজীব আর ওর একান্নবর্তী পরিবারের কথা জানতে পারলো, চিন্তায় পড়ে গেল। কিন্তু শ্রেয়ার মতিগতি দেখে বুঝলো, শ্রেয়াকে বারণ করে কোন লাভ হবে না। তাই যেমন চলছে, চলতে দিল। কোথাও বেড়াতে যাবার হলে, রাজীবের বাড়ি থেকে অনুমতি চাওয়া হয়। শ্রেয়ার বাবা-মা আপত্তি করে না।
এ ভাবেই চলার পর এবার উভয় পরিবার চাইলো রাজীব-শ্রেয়ার বিয়েটা এবার হয়ে যাক। দুই পরিবারের মধ্যে আসা-যাওয়া আলোচনার মাধ্যমে দিনক্ষণ সব স্থির হয়ে গেল। বিয়ের কথাবার্তা চলাকালীন একদিন রাজীব শ্রেয়াকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, " কিরে হানিমুনে কোথায় যেতে চাস বল, আমি আগে থেকে সব ব্যবস্থা করে রাখি।" রাজীব-শ্রেয়া যখন একা থাকতো, তখন তুই করে কথা বলতো, সকলের সামনে 'তুমি' করে বলতো। রাজীবের কথায় শ্রেয়া বললো, " ও নিয়ে তুই চিন্তা করিস না, আমি সব বন্দোবস্ত করে নেবো।" রাজীব বললো," ঠিক আছে করিস, কিন্তু টাকা কতো লাগবে সেটা তো বলবি।" শ্রেয়া বলে " কেন রে , কোথায় লেখা আছে যে বরকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে। আমিও তো রোজগার করি, আমাদের হানিমুনের জন্য আমি খরচ করবো।" এরপর রাজীব আর কিছু বলেনি, জানে কোন লাভ হবে না।
খুব ধুমধাম করে রাজীব-শ্রেয়ার বিয়ে সম্পন্ন হলো। রাজীবের বিয়ের খরচ খরচা শুধু রাজীবের বাবার ওপরই ছিল না। রাজীবের এক জ্যাঠা, জ্যাঠার দুই ছেলে আর রাজীবের দুই কাকা - সকলে মিলেমিশে খরচ করেছে। এক পয়সাও চাহিদা ছিল না। একটা মেয়ে হিসেবে শ্রেয়ার বাবা-মা নিজের সাধ পূরণ করেছেন। রাজীব চুপ করে থেকে দেখছে, শ্রেয়া ওর বাড়ির প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, রাজীবকে কেউ পাত্তাই দেয় না। শ্রেয়ার ওপরও ওর একটু অভিমান হয়েছে। মনে মনে ভাবছে, যার জন্য এই সুন্দর পরিবার পেলি , সেই এখন ফেলনা!! আমার সঙ্গে কথা বলার ফুরসত পর্যন্ত নেই !! একবার হানিমুনে চল, সব সুদে-আসলে তুলে নেব। শ্রেয়ার বাবা-মায়েরও মেয়ের দিক থেকে চিন্তা দূর হয়ে গেছে। মেয়ে শ্বশুরবাড়ির সকলের সঙ্গে সহজেই মিলেমিশে গেছে আর এতো বড়ো পরিবারের প্রতিটি সদস্য শ্রেয়াকে ভালোবাসে। একটি মেয়ের বাবা-মায়ের কাছে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে।
যেদিন রাজীব আর শ্রেয়া দ্বিরাগমন থেকে ফিরলো, তার পরেরদিন সকালে প্রায় সকলেই ব্রেকফাষ্ট করতে বসেছে। রাজীবের মা, বোন আর শ্রেয়া সবাইকে খেতে দিয়ে নিজেরাও বসেছে। সবাই কথা বলছে, আর খাচ্ছে। রাজীব শ্রেয়ার পাশে বসে খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে খুনসুটি করছে। রাজীবের বোন রিয়ার চোখে পড়তেই, মজা করার জন্য বলে উঠলো, " বৌমণি তোমরা হানিমুনে কোথায় যাচ্ছো ? ঠিক হয়ে গেছে ? " শ্রেয়া বললো, সে তো কবেই ঠিক হয়ে গেছে।" রিয়া লাফিয়ে উঠে বলে," সত্যি !! কোথায় গো বলো না।" রিয়া বলে বলছি, বলে হাত ধুয়ে, তাড়াতাড়ি নিজেদের ঘরে গিয়ে একটা খাম নিয়ে এলো। রাজীবের বুকের ভিতর ধুকপুক হচ্ছে, কে জানে কি বলবে মেয়েটা, বাড়ির বড়রা কি ভাববে। সবাই অপেক্ষা করছে, শ্রেয়ার কথা শোনার জন্য। রিয়া তাড়া লাগালো, "কি গো বলো।" শ্রেয়া বললো, " জগন্নাথ দেবের শ্রীক্ষেত্র পুরীতে যাবো।" সবাই শুনে হা !! রিয়া তো বলেই ফেললো," what ! পুরী! দাদা আর তুমি পুরীতে হানিমুন করতে যাবে? পাগল নাকি তোমরা?" শ্রেয়া হেসে বললো, " না একদম আমরা পাগল নই, আর এ ব্যাপারে তোমার দাদা কিছুই জানে না। আর শুধু আমি আর তোমার দাদা নয়, আমরা সবাই মানে জ্যাঠার বাড়ির সকলে, দুই কাকার বাড়ির সকলে, আমরা এই ক'জন আর আমার বাবা-মা সকলে একসঙ্গে আমরা পুরীতে বেড়াতে যাবো।" রাজীব শুনে অবাক। এ মেয়েটা বলে কি ? পরিবারের সকলকে নিয়ে কে হানিমুনে যায় ? মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। রাজীবের মা এবার বললেন, " এটা আবার হয় না কি? বিয়ের পর তুমি প্রথম তোমার বরের সঙ্গে বেড়াতে যাবে, সেখানে পরিবারের কি কাজ ? " শ্রেয়া শাশুড়ী মায়ের পাশে এসে বসে বললো, " মা আমি সমুদ্র ভীষণ ভালোবাসি, তাই পুরীর টিকিট কেটেছি আর আমি শুরু থেকে দেখে আসছি, তোমরা সবাই একসঙ্গে বেড়াতে যাও আর রাজীব সবাইকে এতোটাই ভালোবাসে যে আমার সঙ্গে একা বেড়াতে গেলে, ও তেমন ভাবে enjoy করতে পারবে না, আর ও খুশী না থাকলে আমি কি করে খুশী হই বলো? তোমরা এসব আর ভেবে না, ব্যস যাবার জন্য সকলে তৈরী হও। পরশু ট্রেন। আমি জ্যাঠা আর কাকাদের বলে আসছি।"
কেউ আর আপত্তি করেনি। কিন্তু রাজীবের হয়েছে সমস্যা। ও শ্রেয়ার ওপর রাগ করবে না খুশি হবে সেটাই ভেবে,পাচ্ছে না। শ্রেয়া যে ওর এতোবড়ো পরিবারকে এভাবে আপন করে নেবে, এটা ও ভাবেই নি।
নির্দিষ্ট দিনে রাজীব আর শ্রেয়ার বাড়ির সকলে মিলে জগন্নাথ ধাম পুরী যাবার ট্রেনে উঠলো। খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হল্লা করতে করতে পরের দিন ভোর ভোর সকলে পুরীতে পৌঁছে গেল। সেদিনটা সকলে যাবার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে,সমুদ্র স্নানে গেল। আঁশ মিটিয়ে সকলে নিজের নিজের মতো করে সমুদ্র -স্নান করলো। দুপুরে খেয়ে, বিশ্রাম করে আবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত উত্তাল সমুদ্রের সান্নিধ্যে কাটিয়ে একেবারে ডিনার করে সবাই সবার রুমে চলে গেল। টিকিট কাটা আর হোটেল বুকিং করা - পুরোটা শ্রেয়া খুব সুন্দর করে করেছে। কোথাও কোন খুঁত রাখেনি। সকলে খুব খুশী শ্রেয়ার মতো মেয়েকে বাড়ির বৌ হিসেবে পেয়ে।
হোটেল-রুমের বারান্দায় শ্রেয়া দাঁড়িয়ে আছে। অদূরে রাতের সমুদ্র যেন আরো উত্তাল হয়ে উঠেছে। আজ পূর্ণিমা। আকাশে বিরাট চাঁদটা সমুদ্রের জলে মুখ দেখছে আর বার বার ভেঙে যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। অদ্ভুত সুন্দর বাতাবরণ। সমুদ্রের সাদা ফেনা গুলো অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। সমুদ্রের হাওয়া এসে শ্রেয়ার চুলগুলো বার বার ঘেঁটে দিয়ে যাচ্ছে। রাজীব খোঁজ নিতে গেছে, কারো কিছু লাগবে কিনা।
একটু পর রাজীব এসে পিছন থেকে শ্রেয়াকে জড়িয়ে ধরে ,ওর চুলে মুখ গুঁজে দিল। রাজীবের স্পর্শে শ্রেয়া মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলো। রাজীব অভিমানী গলায় বলে উঠলো, " দিলি তো আমাদের হানিমুনটার বারোটা বাজিয়ে, ভাবলাম কটা দিন শুধু তোকে একা পাবো। তা না, তুই সকলকে একসঙ্গে নিয়ে এলি মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে। তোর মাথাটা ঠিক আছে তো।" রাজীবের কথা শুনে শ্রেয়া খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, তারপর রাজীবের মুখটা ধরে আকাশের দিকে ফিরিয়ে বললো, " ঐ দেখ কি সুন্দর চাঁদ আর দেখ কি সুন্দর সামুদ্রিক হাওয়া আর কি সুন্দর রাত ! আর তোর আর আমার মাঝে এই রাতে আর কে আছে রে বুদ্ধুরাম ? আর নিজের মনকে জিজ্ঞেস করে দেখ, তুই কি সত্যিই খুশি নস, আমরা সকলে একসঙ্গে বেড়াতে এসেছি বলে ? " রাজীব বলে, " না তা নয়, আমি খুশি কিন্তু আমাদের হনিমুন যে - শ্রেয়া বাধা দিয়ে বলে উঠলো, "ঐ দেখ তোর মুন, আর এই হলো তোর হানি।" এই বলে নিজের নরম ঠোঁট মিশিয়ে দিল রাজীবের ঠোঁটে।
🆃 🅷 🅰 🅽 🅺 🆈 🅾 🆄


