শিরোনাম: ☆ মায়ের দিন ☆
লিখেছেন: ◇ ঋতব্রত ◇
চললে, মা? তোমার ছেলেকে ছেড়ে
রেখে অনিশ্চিত সময়ে, দুর্বোধ্য একটা প্রাচীরের সামনে ফেলে
রেখে হঠাৎ করে কি করে তুমি হারিয়ে গেলে, মা?
আমাদের থার্ড রোডের বাড়ির চারপাশটাও পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল,
তোমার মনে আছে?
এই প্রাচীরটার মত অত উঁচু ছিল না সেটা,
নীচে দাঁড়ালে পিঙ্কুদের বাড়ির দোতলাটা, ঘোরানো সিঁড়ি সব সব দেখা যেত,
পলি-দি ছাদে উঠে চুল খুলে দাঁড়াত, কত্ত চুল ছিল না, মা, পলিদির মাথায়?
মনে আছে, মা, আমি তোমায় একবার জিগ্যেস করেছিলাম,
দাও না এনে পলি-দির মতো একটা দিদি?
আমি তার চুল বেঁধে দেব। তুমি চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছিলে,
ওরম চোখ পাকালে তোমার ঠোঁটদুটো সরু হয়ে আসত,
আমার খুব ভয় করত তখন, এক ছুটে ছাদে চলে যেতাম।
তুমি কিন্তু কোনোদিন পেছন পেছন ধাওয়া করে ছাদে উঠে আসতে না।
ছাদে ওঠার সময় ছিল তোমার সন্ধ্যে হবার আগে,
কোনো কোনো দিন বিকেল হলে তুমি হলুদ শাড়ি পরতে, কপালে ছোট্ট পুঁথির মতো সিঁদুরের টীপ।
আমার আর খেলতে যাওয়া হোতো না সেদিন।
লুকিয়ে থেকে ওই ঝাঁকড়া শিউলি গাছটার নীচে,
ওখানে পাঁচিলের গা ঘেঁষে আমার একটা বসবার জায়গা ছিল, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একটা ছেদ বানিয়েছিলাম চৌহুদ্দির ওপারটা
রাণা-দার বাড়ির দিকের রাস্তাটা দেখতে পাব বলে।
বাবাই চলে যাবার পর আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলেও আমি ভয় পেয়ে যেতুম।
যাচ্ছ, যাও, মা। বাবাই কিন্তু রাগ করবে তোমায় দেখে
বলে দিলুম।
তুমি ত বুড়ি হয়ে গেছ, দাঁতগুলো এখন সব এবড়ো খেবড়ো
মুখটা কিরম বেঁকে থাকে তোমার,
শীর্ণকায় হয়ে গেছ,
হাঁটতেও পার না আজকাল, সেই যে চার বছর আগে
কোমরের হাড় ভেঙে বিছানা নিয়েছিলে
সেখান থেকে আর তোমায় দাঁড় করাতে পারলাম না,
তোমার কি আর ইচ্ছে করে না আবার হেঁটে বাড়ির পাশে শিবমন্দিরে যেতে!
কত কী-ই তোমার ইচ্ছে পুরো করতে পারলাম না, মা।
তুমি ভীষণ ফিল্ম দেখতে ভালবাসতে, সুচিত্রা সেন তোমার প্রিয়তম শিল্পী ছিলেন,
আমার আবার সুচিত্রা সেনের অভিনয় ভাল্লাগতো না,
এ নিয়ে অনেক তর্ক করেছি তোমার সাথে, আগে তুমি রেগে যেতে,
ইদানীং দেখেছি, তুমি রাগ করতে না, চুপ করে আমার অভিযোগগুলো শুনতে,
কি ভাবতে তুমি, মা? ছেলেমানুষ, একদিন ঠিক ভুল বুঝতে পারবে?
আমার ফিল্ম দেখার নেশা তোমার থেকেই পাওয়া,
কত ফিল্ম দেখি আজকাল, বিদেশী ছবি সব,
স্ক্যান্ডেনেভিয়, ইস্ট ইউরোপীয়, লাতিন অ্যামেরিকান, ফ্রেঞ্চ, জাপানী, ইরানী - তুমি বুঝবে না বলে কোনো ছবির গল্প তোমাকে শোনাই না,
ছবি এখন ডকুমেন্টারি, জানো, মা,
কালচার এখন আণ্ডারগ্রাউণ্ড, এখন ক্ল্যাঁদেস্তাইন থাকার যুগ, ও-সব তুমি বুঝবে না।
জানো, মা, আজ একটা ক্যানাডিয়ান ছবি,
Pieces of a woman
ফিলিপিনি এক মা, জু আপলাওঁ, অঙ্কভাষার অধ্যাপিকা,
আজ এই মাতৃদিবসে এই ছবিটাই বেছে বেছে রিভিউ করেছেন, পড়ছিলাম।
পড়ার পর দেখলাম নেটফ্লিক্সে।
একটি মেয়ের খণ্ডিত জীবন থেকে নেয়া টুকরো টাকরা কিছু সময়ের কথা,
বাচ্চা বিয়োনোর পর তার বাচ্চাটি তার কোলে শোয়া অবস্থাতেই মারা যায়,
তারপর মেয়েটির জীবনে অনেক টানাপোড়েন এই নিয়ে ছবি।
মা হওয়ার সময়কার সমস্ত কষ্ট সে সহ্য করেছিল,
না-ই বা হতে পারল সে একজন সাক্সেসফুল মা, তবু সে ত মা। মা-ই, তাই না?
মেয়েটির চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভ্যানেসা কির্বি, তুমি অবশ্যই চেনো না ওঁকে, ৩৩ বছর বয়স ভ্যানেসা-র এখন,
কি করে যে ওরম একটা অভিনয় আনলেন আমি জানি না,
আমি হবার সময় তুমি কিভাবে ছটফট করেছিলে আমার জানা নেই,
আর আমার জন্মস্থান সে ত সূচ দিয়ে সেলাই হয়ে গেছে কবেই তখনো আমার চোখ ফোটে নি,
আর আজ তোমাকে দাহ করার সাথে সাথে, মা,
চিরদিনের মতন আমার জন্মস্থান মিলিয়ে গেল।
যাই হোক, যা বলছিলাম, বাবাই রাগ করবে তোমায় দেখে,
বলবে, এহ্ বড্ড বুড়ি হয়ে গেছ তুমি,
বাবাই ত এখন মধ্য গগনে,
একটু একটু চুল হ্রাস পাচ্ছে কপালের দিক থেকে,
সুঠাম মেদহীন চেহারা,
বাবাইএর পাশে তুমি মানিয়ে গেছ, মা?
খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, জানো, একবার আসবে
ওই রাণা-দার বাড়ির পাশের রাস্তাটায়
তোমরা দুজনে?
আমি চুপিচুপি ওই ছোটোবেলার ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে দেখব,
কেউ দেখতেও পাবে না, প্রমিস্।
● লেখা পাঠানা:-
+91 6289 281 406
● ফেসবুক গ্রুপ:- https://www.facebook.com/groups/851998065527743/?ref=share


