𝕾𝖆𝖆𝖍𝖎𝖙𝖎𝖐 𝕻𝖗𝖔𝖐𝖘𝖍
╔═══════ welcome ════════╗
শিরোনাম:
❀ ছুটির ঘন্টা ❀
লিখেছেন: ֎ রত্না দত্ত ֎
⊰᯽⊱┈──╌❊ - ❊╌──┈⊰᯽⊱
- মধু! তাড়াতাড়ি বাজার করে নিয়ে আয়! মাছ,মাংস, ডিম আর যা যা ফর্দতে লিখে
দিয়েছি সব আনবি কিন্তু।চিংড়ি মাছ পেলে একটু বেশিই নিবি।গলদা হলে দুটো বড়
নারকোলও নিয়ে নিস!যা,যা,তাড়াতাড়ি যা!আজ যে আমার অনেক কাজ।এক্ষুনি রঙের
মিস্ত্রিগুলো ঢুকে যাবে।দেখলি না মইটা রেখে দিয়ে গেল একজন।
- যাচ্ছি মা যাচ্ছি! ঝড়ের গতিতে তুমি যা বললে তাতে আমার নাভিশ্বাস উঠে গেল। উফ্!
এতকিছু কি মনে রাখা যায়,তুমিই বলো!
- খুব যায়! এসব মনে রাখতে গেলে তোর নাভিশ্বাস ওঠে।আর টিভির ওই সিরিয়ালগুলোর
পরপর এপিসোডগুলো মনে রাখতে গেলে তোর নাভিশ্বাস ওঠে না!
বুবুন কোথায় গেল রে মধু?
- জানি না তো মা!সকালে তো বৈঠকখানার ঘরেই কর্তাবাবুর সঙ্গে বসে বসে গল্প
করছিল।তারপরে আর দেখিনি।
- কোথায় আবার! গতকাল থেকে স্কুলের ছুটি পড়েছে।শুরু হল ছেলের পেছনে আমার
ঘোড়াদৌড়।ছেলের এখন টিকি মেলাই ভার।
আবার দাঁড়িয়ে রইলি! মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কি দেখছিস?যা..............।কখন
রান্নাবান্না করব?আমার হয়েছে যত জ্বালা।ওই সুগারের বুড়ো মানুষটাকে টাইমে টাইমে
খেতে না দিলে................।
- হ্যাঁ মা! এইতো! এই যাব আর আসব।
বলতে বলতে মধু সদর দরজার দিকে পা বাড়াতেই ময়নাকে রান্নার কিছুটা বুঝিয়ে দিয়েই
অনুপমা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এল।ভালো করে মাথায় গামছাটা জড়িয়ে খোঁপার মতো
করে বেঁধে কাপড়ের আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে ফুলঝাড়ু আর কাপড় নিয়ে শোবার
ঘরের খাটের তলা পরিষ্কার করতে শুরু করল।পরিষ্কার করতে করতে নিজের মনেই গজগজ করতে
লাগল।
- যত্ত সব আবর্জনা! যা পেরেছে এনে ঢুকিয়েছে।খাটের তলা যেন আবর্জনার
স্তূপ।কাগজ,পেন্সিল,রঙের বাক্স কত যে কিনেছে আর জমা করেছে।সব ওই বুড়োর
আস্কারা।নাতি যা বলছে সঙ্গে সঙ্গে এনে হাজির করে দিচ্ছে।মুখে ' না ' নেই!নাতির
আবদার,নাতির বায়না যেন শিরোধার্য।আর নাতি যে আদরে বাঁদর তৈরি হচ্ছে সেদিকে ওনার
কোনো খেয়ালই নেই।যেমন ছেলের বাবা,তেমনই ঠাকুরদা।দুজনেই সমান তালে পাল্লা দিয়ে
নাতির সঙ্গে আর একা আমিই যেন যত শত্রু।রাগে বিড়বিড় করতে লাগল অনুপমা।
হঠাৎ করেই বড় কাঠের বাক্সটা টেনে বের করতেই একরাশ ছোটো ছোটো
আরশোলা আর মাকড়সা যেন বেরিয়ে এল বাক্সটার চারিপাশ থেকে।আরশোলা দেখলেই তো
অনুপমার গা শিউরে ওঠে।তাই সে ভয়ে চিৎকার করতে লাগল।এমনভাবে চিৎকার করতে লাগলো
যেন বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। চিৎকারে ততক্ষণে বুবুন,বুবুনের ঠাকুরদা আর বাড়ির
অন্যান্য সদস্যরা সবাই হাজির হয়েছে।কাঠের বাক্সটা কোনরকমে খুলেই আবার দ্বিগুণ
স্বরে চিৎকার করতে লাগল অনুপমা।বাক্সের ভেতর থেকে ধূলোর আস্তরণে ঢাকা
খাতা,কাগজ,পেন্সিল,রঙের
বাক্স,এক বান্ডিল ঘুড়ি, লাটাই সব বার করে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ঘরের বাইরে ফেলতে লাগল।
মায়ের রুদ্রমূর্তি দেখে বুবুন তো ভয়ে দরজার পাশে সিটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কিন্তু
বুবুনের ঠাকুরদা অর্থাৎ শ্রীযুক্ত শঙ্কর নারায়ণ চক্রবর্তী,তিনি কিন্তু
প্রতিবাদের তীর নিক্ষেপ করলেন বৌমার দিকে। স্নেহের নাতির এইসব মূল্যবান
জিনিসগুলোর এমনভাবে অনাদর,অবহেলা তিনি সহ্য করতে পারলেন না।গম্ভীর স্বরে বললেন,
- এ কি বৌমা!এগুলোকে এমনভাবে ছুঁড়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলছ কেন?এগুলো কি দোষ
করল?এগুলো দাদুভাই - এর অসময়ের সাথী,বন্ধু,এদেরকে ওর থেকে বঞ্চিত কোরো না!
- না বাবা! আপনি বুঝতে পারছেন না।আজ একটু বাদেই রঙের মিস্ত্রিরা এসে পড়বে।তখন
আমি আর সময় পাব না।তাই এসমস্ত জঞ্জালকে ফেলে দিলে খাটের তলাটা পরিষ্কার থাকবে।
- কী বললে? এগুলো জঞ্জাল!তুমিও যখন ছোটো ছিলে তোমার বাড়িতেও নাকি পুতুল খেলার
একটা বড় ট্রাঙ্ক ছিল।সেটাও শুনেছি তোমাদের খাটের তলায় রাখা থাকত।স্কুল ছুটির পর
বাড়ি ফিরে তুমিও নাকি রোজ বিকেল বেলায় ছাদে বন্ধুদের সাথে পুতুল খেলা,
রান্নাবাটি খেলতে! তাহলে দাদুভাই - এর বেলায় কেন .................?
বুবুন যেন ঠাকুরদার কথায় কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এক পা এক পা করে এগিয়ে
গিয়ে ফেলে দেওয়া সব জিনিসগুলো একটা একটা করে বুকে তুলে নিতে লাগল। ঠাকুরদাও
বুবুনের সাথে হাত মিলিয়ে বুবুনকে সাহায্য করতে লাগল।উনি অনুপমার দিকে তাকিয়ে
বললেন,
- দেখো বৌমা! জিনিসগুলো কত মানিয়েছে আমার দাদুভাই - এর হাতে।ওদের এই ছোট্ট ছোট্ট
হাতে এখন ঐ ভারী ভারী বই এর ব্যাগগুলো তুলে না দিয়ে এইসব ছোট্ট ছোট্ট খেলার
মুহূর্তগুলোকে তুলে দাও।ওদেরকে বাঁচার রসদ জোগাও।এই খড়কুটো গুলোকেই
আঁকড়ে ধরে ওরা ভবিষ্যত দেখবে।সুন্দর ভবিষ্যত।যে ভবিষ্যত একদিন তুমিও
দেখেছিলে,আমিও দেখেছিলাম।তবে ওকে কেন এই পরম সুখ থেকে বঞ্চিত করছ.......?
এই পুজোর ছুটির দিনগুলোতে ওকে ওর মতো করে স্বপ্ন দেখতে দাও।আর ঐ দেখা
স্বপ্নগুলোকে রঙ, পেন্সিল,তুলি দিয়ে খাতার পাতায় পাতায় ভরিয়ে তুলুক।জীবন্ত
হয়ে উঠুক ওর মনের ক্যানভাসে ওর কল্পনার জগৎ।আমাদের আজকের এই কংক্রিটের জীবন থেকে
ওকে অন্ততঃ একটু মুক্তি দাও।একটু মুক্ত নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দাও।ছুটির মেজাজে গা
ভাসিয়ে চলো না আমরাও আজ ছুটির গন্ধ গায়ে মাখি।দেখবে! সে গন্ধ কত মধুর।সে যে
অকৃত্রিম,নির্ভেজাল।
মা আসছেন..........।দেখছ না! চারিদিকে কেমন মন পাগল করা ছুটি ছুটি গন্ধ,আগমনীর
সুবাস।
অনুপমা আর কোনো কথা বলতে পারল না।শুধু দুচোখের আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল দু
- গাল বেয়ে।ঘরের বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল।দেখতে পেল ছোট্ট বুবুন ওর সবথেকে
কাছের বন্ধু ঠাকুরদার সঙ্গে তিনতলার ছাদে ঘুড়ি আর লাটাই নিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে
ব্যস্ত। কী তৃপ্তি, কী উচ্ছ্বাস ওদের দুজনের চোখেমুখে।এটাই নাকি ' ছেলেবেলা ' র
সংজ্ঞা।সত্যিই তাই.............।
হঠাৎ অনুপমার সম্বিত ফিরল মধুর হাঁকডাকে।
- মা! ও মা! কোথায় গো? আমি এসে গেছি আর ঐ দেখ রঙের মিস্ত্রিরাও এসে গেছে।
- যা....... ই!
ফুলঝাড়ু ফেলে রেখে অনুপমা পা বাড়াল সিঁড়ির দিকে।
🆃 🅷 🅰 🅽 🅺 🆈 🅾 🆄


