𝕾𝖆𝖆𝖍𝖎𝖙𝖎𝖐 𝕻𝖗𝖔𝖐𝖘𝖍
╔═══════ welcome ════════╗
শিরোনাম: ❀ জলেভাসা বাবা ❀
লিখেছেন: ֎ তফিল উদ্দিন মণ্ডল ֎
⊰᯽⊱┈──╌❊ - ❊╌──┈⊰᯽⊱
হঠাৎ জনস্রোত। আষাঢ়ের দুকূলপ্লাবী উদ্যাম স্রোতের মত।সকলের মুখে এক কথা হযরত জলে ভাসা হুজুরকে দেখতে যাবো।এই হুজুর এমন কামেল যে,যার দীলে যে মকসুদ আছে তিনি সব পূরণ করতে পারেন।
কদিন থেকেই এই জনস্রোত চলছে।লোকমুখে তাঁর কামেলিয়াতের বাখান চলছে।হুজুরের রুহানিয়াত বেশুমার দরাজ।তাঁর খানকা থেকে কেউ নিরাশ হয়ে ফেরে না।
আবদুর রউফ কলেজে পড়ে।সে যেদিন কলেজ হোস্টেল থেকে বাড়িতে এলো সেদিন তার বাড়িতে নানা আয়োজন চলছিল।সোয়া সের চাল,এক টাকা সোয়া পাঁচ আনা পয়সা,নতুন গামছা,কলুর ঘানির পয়লা ধারার তেল,লাল ঝুটির মোরগ,সোয়া তিন টাকার তহবন আরও অনেক কিছু।
আবদুর রউফ তার মাকে বললো, মা,এত আয়োজন কিসের? মা বললো,তোর চাচী জেঠিরা ধরেছেন জলেভাসা বাবার কাছে যাবো।তাই তার দর্শনীর জোগার যন্তর করা হচ্ছে।
আবদুর রউফ আশ্চর্য হয়ে বললো,জলে ভাসা বাবা! সে আবার কে মা?
----ও মা,তুই জানিস না? মুল্লুকের মানুষ ভেঙ্গে পড়ছে হুজুরের কাছে।হুজুর খুব কামেল পীর।তার কাছে যে যা চায় তাই পায়।
আবদুর রউফ এ নিয়ে আর কথা বাড়ায় না।এই সব মানুষ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। যদিও ধর্ম সম্পর্কে তাদের সামান্য ধারণাও নেই।
বিকালে গ্রামের স্কুল মাঠে আবদুর রউফ তার বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কথায় কথায় ওয়াহেদ বললো, আরে চল না।কাল জলেভাসা হুজুর দেখে আসি।
আবদুর রউফ বললো,তোরা কি বুঝতে পাচ্ছিস,এই জলেভাসা হুজুর হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হল?
বিল্লাল ছিল অত্যন্ত কৌতূহলী ছেলে।সে বললো, জানি তো,আমি সব জানি।
সবাই একবাক্যে রৈ রৈ করে উঠলো। আরে,বেটা বিবিসি এত খবর জানিস তা আগে বলবি না?
বন্ধু বান্ধবদের কাছে ওয়াহেদ বিবিসি বলে পরিচিত।এলাকায় কার সাথে কোন মেয়ের প্রেম,কার বউ কার সাথে ঘর ছেড়েছে,কার কোথায় জমি নিয়ে বিবাদ সব খবর সবার জানার আগে বিল্লাল জেনে ফেলে।সকলের কাছে সে সব খবর সোল্লাসে পরিবেশন করে।আজ বন্ধুদের আড্ডায় সে জলেভাসা হুজুরের আকস্মিক আগমনের বার্তা পরিবেশন করতে শুরু করলো।
বিল্লাল বলতে লাগলো, গেল বৈশাখের শেষের দিকে একরাতে ইন্নত আলি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাড়ির পশ্চিম দিকে বেরিয়েছিল।ইন্নত আলির বাড়িটি যমুনার তীর ঘেঁষে। তাই বাইরে পা ফেললেই যমুনা।সে রাতে বইছিল চান্দিনার জোছনা।ইন্নত আলি যমুনা তীরে ছাতাইন গাছটার কাছে প্রাকৃতিক কাজের জন্য বসেছিল। হঠাৎ উজান দিকে দৃষ্টি পড়তেই দূরে অস্পষ্ট কী যেন একটা ভেসে আসতে দেখল। নদীর কাছাড়ের নিচে খেয়াঘাটে শৌচ কর্ম করে দাঁড়িয়ে রইল সে। ক্রমে ভেসে আসা বস্তুটি কাছাকাছি হতেই বিস্ময়ে ইন্নত আলির চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।দেখল,পানির উপর চটের ছালা বিছিয়ে কেউ একজন আসছে।ইন্নত আলি পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে দেখছে।আস্তে আস্তে ছালায় বসা লোকটি ঘাটে এসে থামল।
ইন্নত আলি মনে মনে ভয় পাচ্ছিল।ভয়ের চাইতে তার কৌতূহলটা ছিল প্রবল।তাই আল্লাহ নবীর নাম নিয়ে সাহসে ভর করে সে এগিয়ে গেল।একেবার কাছে গিয়ে দেখল,ঢেউয়ের তালে ভাসমান ছালা দোলছে।লোকটিও দোলছে।লোকটি চোখ বন্ধ করে যোগাসনে বসা। শরীরের উর্ধ্বাংশ খালি।কোন কাপড় চোপর নেই।পরণে হাঁটু পর্যন্ত শাদা মার্কিন কাপড়।মুখ মণ্ডল গোঁফ দাড়ির অরণ্যে ঢাকা।গায়র রঙ তপ্ত কাঞ্চনের মত।
--- হঠাৎ করে তার কণ্ঠ থেকে আওয়াজ এলো,ইন্নত আলি!
ইন্নত আলি চমকে উঠলো। সে ভাবলো,অচেনা অজানা এই লোক আমার নাম জানলো কি করে।ইন্নত আলি কাছে গিয়ে বললো,জ্বী কিছু বলবেন?
----তুই আমাকে আমার বাবার কাছে পৌঁছে দে।
ইন্নত আলি বললো,আমি তো জানি না আপনার বাবা কে?
-----আলবৎ জানস।মঈনুদ্দিন আকন্দ কে চিনিস না?তোর গাঁয়েই তো বাড়ি।
মইনুূূদ্দিন আকন্দ এলাকার ধনাঢ্য লোক।তার পূর্ব পুরুষদের জমিদারি ছিল।জমিদারি চলে যাবার পরও তাদের জৌলুশ একটুও কমে নি।
--- ইন্নত আলি বলল,আকন্দ সাহেবকে চিনবো না মানে,?আমরা তো তাদের ফাই ফরমাস খেটেই খাই।কিন্তু তার তো দুই ছেলে শামসুদ্দিন আর জহিরুল।আর কোন ছেলে আছে বলে তো জানি না।
লোকটি ধমক দিয়ে বলল,আরে মূর্খ আমি যা বলছি তাই কর।তুই সেদিনের ছোকরা। কে কয় ছেলে পয়দা করেছে সেটা তুই জানবি কি করে?
--- কথা শেষ হতে না হতেই ইন্নত আলি লক্ষ্য করল, ছালাটি খালি পড়ে আছে অথচ লোকটি নেই।সে আশ্চর্য হয়ে এদিক সেদিক তাকাতেই দেখে লোকটি ছাতাইন গাছের নিচে দাঁড়ানো।তার পরনে সাদা পাঞ্জাবী।গলায় চাঁদর,হাতে তসবিহ। ইন্নত আলি দৌড়ে গিয়ে তার পায়ে পড়ে গেল।সে হাঁফাতে হাঁফাতে বলতে লাগলো,বাবা,আপনি যেমন তেমন কেউ নন।আপনি জব্বর বুজুর্গ। নাহশ আল্লাহর অলি।আমি না জেনে আপনার সাথে বেয়াদবি করেছি।আপনি আমাকে মাফ করে দিন।
লোকটি বললো,উঠ বেটা,উঠ।তুই তো বুজদীল,জহীন্।তোর মত আনপড়হ ইনসানের পক্ষে আমাকে চেনা সম্ভব নয়।আমাকে বুঝতে হলে রুহানিয়াতের দরওয়াজা কোশাদা করতে হব।কমসে কম এক শ বছর মোরাকাবায় খুদীকে দাখিল করতে হবে।তোর কোন দোষ নেই।
ইন্নত আলি লোকটির এরকম উচ্চমার্গীয় বয়ানের বিন্দু বিসর্গ কিছুই বুঝলো না।শুধু বললো,হুজুর,আমি আপনাকে পৌঁছায়ে দিয়ে আসি।
৷ আরে নাদান।আমি আরশে মাওলা থেকে তেরশ কদম দূরত্বে বসে মোরাকাবা করি।সেখান থেকে ভেসে ভেসে আমি এখানে এসেছি।আর আমার বাবার বাড়ি পৌঁছতে বুঝি তোকে সাথে নিতে হবে।দরকার নাই।তবে শোন তোর সাথে যে আমার মোলাকাত হলো,বাতচিত হল এ কথা কাউকে কখনো বলবি না।বললে,তুই আওলাদ বুনিয়াদসহ ছঙ্খেছার হয়ে যাবি।এখন বাড়ি যা।যা তাড়াতাড়ি।
বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে ইন্নত আলি দেখে লোকটি অদৃশ্য হয়ে গেছে।
পরদিন সারা এলাকায় একটি খবর বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়লো।তা হলো,মঈনুদ্দিন আকন্দের বড় ছেলে তছরুদ্দি ফিরে এসেছে।
পুরনো লোকজন জানতো তছরুদ্দি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে শহীদ হয়েছে।তার বাবা সেকারণে খোঁজখবর নেয়নি।খোঁজ খবর নেয়নি একথা বলা যাবে না।নিয়েছে।স্বাধীনতার পর মঈনুদ্দিন আকন্দ সম্ভবমত খোঁজ খবর করেছে কিন্তু ছেলের কোন হদিস পায়নি।ক্রমে মেনেই নিয়েছে তার ছেলে আর জীবিত নেই।
এখন যখন সেই ছেলে ফিরে আসার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তখন লোক জনের কৌতূহল তো হতেই পারে।তাই কৌতূহলী মানুষ দলে দলে মঈনুদ্দিন আকন্দের বাড়িতে আসতে লাগলো।
২.
মঈনুদ্দিন আকন্দ ছেলেকে ফিরে পেয়ে হাতে আকাশের চাঁদ পেয়েছে।কিন্তু ছেলে তার আগের ছেলে নেই।সারাদিন রাত চোখ বুঁজে বসে থাকে।তসবিহ ঘুরায়।কী কথা তেলাওয়াত করে তা সেই জানে।কারো সাথে সাতদিন একটানা কথা বলে নি।খাবার দিলে সে শুধু খাবার ঘ্রাণ নেয়।
মইনুদ্দিন আকন্দ তার সোমত্ত দুই মেয়েকে তাদের এই নবাগত ভাইয়ের খেদমতে পেশ করলো।
সাতদিন পর হঠাৎ সে আব্বা আব্বা করে ডেকে উঠলো।মঈনুদ্দিন আকন্দ আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছেলেকে জাপটে ধরল।তার স্ত্রী ও দৌড়ে গেল কিন্তু সে কোন রকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো না।অনেক পরে জানা গিয়েছিল যে মঈনুদ্দিন আকন্দের স্ত্রীর গোড়া থেকেই তার ছেলে সম্পর্কে এক রকম সন্দেহ ছিল।
এবার তার উচ্ছ্বসিত বাবা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো,এত বছর কোথায় ছিলি বাপ! এতগুলো বছর চলে গেল একবারও কি মা বাবার কথা মনে পড়ে নি? কত চোখের পানি যে গড়িয়েছে মা বাবার চোখে।কত রাত যে পোড়া চোখে ঘুম আসে নি তা তোকে কি করে বোঝাই রে বাপধন।সন্তান হারানোর ব্যথা যে কত গভীর তা মা বাবা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না।
এভাবে বাপ বেটাতে অনেকক্ষণ রোনাজারি হল।মা দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেললো।
এবার তছরুদ্দি মুখ খুললো।বাবা,পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে আমি গুরুতর আহত হই।যুদ্ধক্ষেত্রেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।চারদিন পর আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন দেখি আমি এক অচেনা জায়গায়।চারপাশে কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে।আল্লাহর জিকির ছাড়া সেখানে আর কিছু শোনা যায় না।
আমি যখন মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলাম তখন তিনজন বুজুর্গ আমাকে নিয়ে এক কামেল হুজুরের শানে পেশ করলেন।হুজুর বিশাল দরিয়ার মাঝে এক জলটুঙিতে তার দরবারে থাকেন।প্রায় পাঁচ শ গজ দূরে ডাঙায় দাঁড়িয়ে এক হুজুর ছালাম দিলেন।জলটুঙি থেকে শুধু একটা হাত বাড়িয়ে দেয়া হল।সে হাত সোনার মত ঝকঝকে,উজ্জ্বল। তারপর আমি শূন্যভরে হুজুরের হাতে গিয়ে পড়ে গেলাম।সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছে স্বপ্নের মত মনে হল।
হুজুর আমাকে খানকার ভিতরে নিয়ে গিয়ে একটা উঁচু পিড়িতে বসালেন।মুখে বিড়বিড় করে অনেকক্ষণ দোয়া দরূদ পড়ে আমার শরীরে ফুঁ দিলেন।তারপর তার ডান হাতখানা মাথায় রাখলেন।আমার মনে হল কী জানি এক প্রশান্তি সাড়া অস্বিত্বে বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়লো। আমাকে তিনি আসতাগফিরুল্লা পড়ালেন একুশ বার।তারপর তিনি হাত তালি দিতেই সাদা ধবধবে লেবাস পড়া তিনজন গেলমান এসে দাঁড়ালো।হুজুর আয়াতুল কুরসি পাঠ করালেন।তারপর ওই তিন গেলমানকে বললেন,একে পবিত্র লওহে মাহফুজ ঘুরিয়ে দীল সাফ করে নিয়ে এসো।
আমি এ পর্যন্তই জানি।তারপর কোথায় কখন কি হয়েছে জানি না।শুধু দেখেছি ধুধু প্রান্তর।ফেরেশতারা দলে দলে বসে আল্লাহ নাম জপ করছে।
আমি যখন হুঁশ ফিরে পেলাম তখন দেখি সামনে হুজুর তাঁর আসনে মোরাকাবা করছেন।আমি এক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম।তিনরাত তিনদিন আমি চেয়েই রইলাম।হুজুরের কী যে কারামতি,আমার ক্ষুধা নেই,তৃষ্ণা নেই,ঘুম নেই এমন কি হাজতেরও কোন বালাই নেই।
হঠাৎ করে হুজুর চোখ খুললেন।তারপর আমার দিকে এগিয়ে এসে সীনা বরাবর মুখ নামিয়ে ফু দিলেন।আমার মনে হলো বেহেশতের বাতাস আমার সীনার মধ্যে বয়ে গেলো।কী শান্তি,কী শান্তি।
হুজুর বললেন,দেখ বেটা তোর সীনা সাফ করার জন্য তোকে লওহে মাহফুজে পাঠানো হয়েছিল। দুনিয়াতে এ রকম খুশদিল নসীব খুব কম ইনসানেরই হয়।কোটি কোটি আলমের মাঝে এরা বেহতর এলেমের অধিকারী হয়। হুজুরের কথা শুনে আমি ডরে ভয়ে বললাম, হুজুর আমি কীভাবে এলেমদার হব।আমি তো ইংরেজি লাইনে মেট্রিক নাগাদ পড়াশোনা করেছি।
হুজুর বলেন,আল্লাহ যার দিলে এলেমের জোশ দান করেন তার কী দুনিয়াবি শিক্ষার প্রয়োজন হয় বেটা।
৩.
এক রাতে আকাশের পূর্নিমার চাঁদ।তিন জন ফেরেশতাবেশী লোক এসে আমাকে বললো,তোমার সিনা দুনিয়া বরাবর করে দেয়া হয়েছে।তুমি পেছনের সকল কিছু চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবে। এখন চলো আমাদের সাথে।
আমি বললাম, হুজুরকে না বলে তো আমি কোথাও যাবো না।
তারা বললো,হুজুর গায়েব হয়ে গেছেন।বহুদূরে কোন একদেশে বুজদিল গুমরাহী মানুষদের দীলের দরওয়াজা খোলার জন্য চলে গেছেন। তার কথা মতই আমরা তোমাকে নিতে এসেছি।
আমি তাদের সাথে চললাম। তারা আমাকে কোন এক নদীর তীরে নিয়ে গেল।তারপর পানির উপর ছালা বিছিয়ে বললো,উঠ।আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠে ছালার উপর বসলাম।ছালা ভাসতে লাগল।আমার জিন্দেগীর সব কথা মনে পড়তে লাগল।
মাইনুদ্দীন আকন্দ ছেলের বয়ান শুনে নিশ্চিত হলেন যে, তার ছেলে এলমে মারেফাত হাসিল করেছে।পরদিনই তার পুকুর পাড়ে খানকা তৈরি করে দিলেন।সপ্তাহের মধ্যেই তার ছেলে হযরত জলেভাসা হুজুর নামে এলাকায় খ্যাত হয়ে উঠলো। কেবল আকন্দ গৃহিণীর মনে খুঁতখুঁত রয়েই গেল।
সেই থেকে হযরত জলেভাসা হুজুর প্রতি সন্ধ্যায় মাহফিল করেন।দূর দূরান্ত থেকে লোকজন আসে। জলে ভাসা হুজুরের বয়ান শোনে।রাত বাড়লে জিকির শুরু হয়।রাতের নীরবতা দীর্ণ করে আল্লাহু আল্লাহু শব্দে দশদিক প্রকম্পিত হয়ে উঠে।কয়েক দিনের মধ্যেই জলেভাসা হুজুরের কারামতের কথা চারিদিকে চাউর হয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এই যেমন হুজুর আধা সের মুড়ি পাঁচহাজার মানুষকে খাওয়ান।তারপরও মুড়ি উদ্বৃত্ত থাকে।হুজুরের পানি পড়া চোখে দিলে জন্মান্ধ পর্যন্ত দৃষ্টি ফিরে পায়।তার নুরানী চেহারার দিকে তাকালে দীল শান্ত হয়ে যায়।
ক্রমেই হুজুরের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো।আব্দুর রউফ একদিন দলবেঁধে সন্ধ্যার পর হুজুরের কারামাতি দেখার জন্য মাহফিলে যোগ দিল।
সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ হযরত জলেভাসা হুজুর তার জন্য নির্ধারিত কুরছিতে এসে বসলেন। জনতা দাঁড়িয়ে সবাই তাঁকে সম্মান জানাল।কেউ কেউ লাফ দিয়ে ঝাঁপ দিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে দস্ত মোবারক চুম্বন করতে লাগল।কেউ কেউ হজুরের কদমবুসিতে মাথা গুজে দিল।হুজুর নিঃশব্দে সকল ভক্তি পকেটস্থ করতে লাগলেন।
হঠাৎ এলায়ন হলো,হুজুর এবার বয়ান করবেন।তারপর হবে জিকির।তারপর হুজুর কারামত প্রদর্শন করবেন।
এবার হুজুর নড়েচড়ে বসলেন।তাঁর আধা নুরানী চেহারা।আর কিছুদিন এমন রাজকীয় যত্নে থাকলে তার চেহারায় জেল্লা ফিনকি দিয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। স্পটই বোঝা যাচ্ছে তিনি নতুন শশ্রুমণ্ডিত হয়েছেন। ডান হাতে ডান কান চেপে ধরে অকস্মাৎ বজ্রের শব্দে উচ্চারণ করলেন, ছুব্বতে ছালে তোরা ছালে কুনাদ।,ছুব্বতে তালে তোরা তালে কুনাদ।
তারপর চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর বললেন,সৎ লোকের সাথে থাকলে সৎ হয় আর অসৎ লোকের সাথে থাকলে বদ হয়। কে বলেছেন? হুংকার দিয়ে জনতার কাছে জানতে চাইলেন। জান না তো? এই অমর বাণী যার তিনি এলমে লাদুন্নি হাসেলকারী পীরানে পীর হযরত মাওলানা রুমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।যাঁর কেতাব সম্পর্কে তিনি তিনি নিজেই দাবী করেছেন, হাস্তে কোরাণ দরজবানে পাহলবী।
এবার জলেভাসা হুজুর কারামত প্রদর্শন করবেন। এক ভক্ত হুজুরের সামনে এক বাটি মুড়ি এনে রাখলেন। হুজুর মজলিসের লোকজনকে দুই তিনটা করে মুড়ি দিতে লাগলেন। তাতে সকলের হাতেই মুড়ি পৌঁছে গেল।ইতো মধ্যেই দেখা গেল হঠাৎ হুজুর ইয়া নবী সালাম আলাইকা বলে দাঁড়িয়ে পড়েছে।মজলিশের তামাম আশেকান একই জপে মশগুল হয়ে উঠছে।
হঠাৎ দরূদ খতম করে মোনাজাত শুরু হল।হুজুর জিন্দার দুনিয়াবী এবংমুর্দার আখেরাতের, পরকালের মঙ্গল কামনা করে রোনাজারীতে সিনা সয়লাব করে ফেলল।
আবদুর রউফ আর তার বন্ধুরা মোনাজাতের পর জলেভাসা হুজুরের সাথে দেখা করতে গেল।হুজুরের খাটিত্ব প্রমাণের জন্য দলের একজন হুজুরের দস্ত মোবারক চুন্বন করার সময় ডান হাতে প্রায় দাঁত বসিয়ে দিল।হুজুর কুঁকড়ে গেলেও নীরব।ফিসফিস করে বলছে, এটা কী হচ্ছে। আবদুর রউফ সহ সবাই একসাথে চিৎকার দিয়ে স্লেগান দিচ্ছে, নারায়ে তকবীর।আল্লাহ আকবর। হযরত জলে ভাসা হুজুর জিন্দাবাদ। হযরত কারামতি হুজুর জিন্দাবাদ।
পরদিন ওরা সবাই মিলে ইন্নত খাঁ কে ডেকে আনল। বৌসের গড় স্কুল মাঠে বসে সবাই জেঁকে ধরলো।বললো,চাচা বলেন তো হুজুরের ঘটনাটা কি? সে কী আসলেই জলে ভেসে এসেছিল?
ইন্নত খাঁ প্রথম দিকে অস্বীকার করলেও এই বিচ্ছুর দলের হাতে সম্ভাব্য হেনস্থার কথা বিবেচনা করে বললো, আচ্ছা আসল ঘটনা আমি খোলাসা করে বলছি।
কয়েক মাস আগে এই জলেভাসা হুজুর আমার বাড়িতে এসেছিল।সন্ধ্যার ঠিক পর পর হবে।আমি গোহালে গরু নিয়ে যাচ্ছি। এমন সময় সে ডেকে বললো, ভাই আপনার সাথে একটা কথা আছে আমার।আমি বললাম, একটু খাড়োন,আমি গরু বেঁধে আসছি।
আমি গরু বেঁধে এসে তাকে বললাম, আপনি কে ভাই?
সে বললো,আমার বাড়িঘর বলতে পারেন নাই।থাকি গারামারা চর নৌকায়। মানুষের খেদমত করি। যাবো বালিজুড়ি কিন্তু পথে রাত হয়ে গেল।এখন আপনি কি আজ রাতের জন্য থাকার একটা সুবন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন?
বললাম, বন্দোবস্ত করে দিতে পারবো তবে সেটা সুবন্দোবস্ত হবে কী না জানি না।
রাতে আমি তাকে আমাদের বাইর বাড়ির কাচারি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করলাম।সাধ্যমত অতিথি আপ্যায়ন করলাম।রাতে খাবার পর খানিকটা খোশ গল্প চলছে।হঠাৎ সে গম্ভীর হয়ে বললো, ভাই আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?
বললাম, আল্লাহর মাল ১১ জন।দুই তরফ।
সে হাসলো।বললো, জমাজমি কতখানি।
বললাম, চার বিঘে।
---- তাহলে তো আপনি খুব কষ্টে দিনগুজরান করেন। আপনার কোন অভাব থাকবে না যদি আপনি আমার কথামত কাজ করেন।
--- কি কাজ করতে বলেন।
তখন সে তার পরিকল্পনার কথা বলল।কিভাবে আমি নদীর ধারে যাব।কীভাবে সে জলে ভেসে আসবে।কীভাবে কারামতির প্রচার করতে হবে। তাছাড়া পাঁচটি এক শ টাকার নোটও আমার হাতে গুঁজে দিল।আমি জীবনে একসাথে এত টাকা দেখি নি। টাকা দেখে আমার মাথা গরম হয়ে গেল।আমি তার কথায় রাজি হয়ে গেলাম।
তোমরা আমাকে বলতে বললে তাই বললাম। তবে একথা আর কাউকে বলো না।তা না হলে জলেভাসা বাবা আমাকে বদদেয়া করবে।
৪.
দিন কয়েক পর রাতের বেলায় আবদুর রউফের নেতৃত্বে দশ বারোজন স্কুল মাঠে একত্রিত হল।সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে পীরের পীরালির গুমর ফাঁক করতে হবে।
আবদুর রউফ বললো, আমি যেমন যেমন বলবো তোরা তেমন তেমন করবি।
আকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল ভাটির দিকে হেলে পড়েছে।সমস্ত পৃথিবী ঘুমে আচ্ছন্ন। মাঝে মধ্যে অচেনা গাছ থেকে কোন এক অনাহারী পাখির অদ্ভুত শব্দ শোনা যাচ্ছে। এমন নীরবতার মধ্যে ওরা চলল জলেভাসা বাবার আস্তানার দিকে।
জলেভাসা হুজুরের আস্তানাটা ছিল বাড়ির পেছনে পুকুরের পাড়ে। বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেই।সবাই গিয়ে আস্তানার উঠানে বসে আচমকা জিকির শুরু করল।থেকে থেকে শামাও গাইছে।
বাবা তুমি খাও যে গপাগপ
তাই তো বাবা করি তোমার জপ।
তুমি বাবা দারুন বাবা
আইস বাবা মুড়ি খাবা
সারা জীবন মুরিদেরে খাওয়াইছো মুড়ি
বাইর হও বাবা এইবারে খাইবে গুড়ি।
হঠাৎ এমন জিকির শুনে জলেভাসা হুজুর ভাবল তার কোন আশেকানরা এসেছে। এই ভেবে সে দরজা খুলে বাইরে আসলো। বাইরে আসা মাত্র দুজনে গামছা দিয়ে আচমকা তার মুখ বেঁধে ফেলল।কোন কিছু বোঝার আগেই জলেভাসা হুজুরকে চ্যাঙদোলা করে নিয়ে যাওয়া হল খানিকটা দূরে রাস্তার কালভার্টের নিচে। আবদুর রউফ হুজুরের চোখে টর্চ লাইট ধরলো।হুজুর ভয়ে কাঁপছে।বিল্লাল বলল, কী হুজুর, আপনে তো জলে ভাইস্যা থাকতে পারেন।তা আজকে আপনেরে হাত পা বাইন্দা জলে ফালাইয়া দিমু।
জলেভাসা হুজুর মিনতি করতে লাগল।জীবনে সে আর এমন কাজ করবে না বলে আল্লাহর নামে শপথ করতে লাগল।অবশেষে আর এখানে থাকবে না।জীবন ভিক্ষা দিলে এখনই সে চলে যাবে।
পরদিন থেকে জলেভাসা হুজুরকে আর কোথাও দেখা গেল না।তার মুরিদেরা প্রচার করতে লাগলো হুজুর উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু মাস তিনেক পর লোকমুখে জানাজানি হয়ে গেল যে,আকন্দ সাহেবের দুই মেয়ে শুধু বমি করছে। তারা হামেল হয়েছে।লোক জন বলাবলি করতে লাগলো এটাও জলেভাসা হুজুরের একরকম কারামতি।
🆃 🅷 🅰 🅽 🅺 🆈 🅾 🆄


