𝕾𝖆𝖆𝖍𝖎𝖙𝖎𝖐 𝕻𝖗𝖔𝖐𝖘𝖍
╔═══════ welcome ════════╗
শিরোনাম: ❀ ব্যাধি ❀
লিখেছেন: ֎ কৃষ্ণা মুখার্জী ֎
⊰᯽⊱┈──╌❊ - ❊╌──┈⊰᯽⊱
"আমি খুব ভালো ভাবেই জানি আমি দেখতে খুবই খারাপ।
হাইট চারফুট ও হবেনা। গায়ের রঙ বেশ কালো। তারপর দুটো চোখ ট্যারা। কোনদিকে তাকাই কেউ বোঝেনা। রোগা ডিগডিগে।" তাও সবসময় বিয়ের কথা কেন বলো?? কে বিয়ে করবে আমাকে??এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে মায়ের দিকে বিরক্ত চোখে তাকায় অচলা।
মেয়ের রাগ দেখে হেসে ফেলে রমলা। বলে, এই জন্যই তো তোর নাম অচলা রেখেছি। আর পড়াশোনা??
"যতদূর মনে পড়ে ফাইভে লাস্ট ইস্কুল গেছি।" সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে অচলা উত্তর দিলো। কী করবো, পড়াশুনা আমার মাথায় ঢুকতোনা পড়তে আমার ভালোও লাগতোনা কোনো কালে।
লজ্জা করছেনা বলতে?? দিদিরা তবু……
অচলা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকে , দিদিরা তবু ইস্কুলের গন্ডি পেরোলেও আমার জন্য তোমার রাতে ঘুম হয়না। আমার একটা হিল্লে হলে তুমি গঙ্গা চান করে শুদ্ধ হবে। আর কতবার শুনবো বলতো এই ডায়লগ গুলো। ভাল্লাগেনা। দাদারো তো একই অবস্থা। ওকে নিয়ে তোমার চিন্তা হয়না!!
ও এখন কারখানায় কাজ করছে। দিদিদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। তাহলে চিন্তা করবো কেন??
"আমি জানি মা আমাকে কেউ কোনদিন ভালোবাসবে না। বিয়ে করবে না। নিজের সংসার পাবোনা। কোন কাজটাজ নিয়ে দাদার সংসারেই জীবন কাটাতে হবে।" মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে অচলা।
রমলা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,কিন্তু তোর সরকারি চাকুরে বাবা, তোকে যে কোনো কাজ করতে দিতে রাজি নন। সমাজে তাঁর একটা সম্মান আছে।
মা তোমার কাছে তো সব সমস্যার একটাই সমাধান ভালো ছেলে দেখে পাত্রস্থ করা। আচ্ছা ভালো পাত্র কি ছেলের হাতের মোয়া!! শুধু তাই নয় ছোট পরিবারে ছেলের নিজের বাড়ি আর ছেলেকে সরকারি চাকুরে বা ব্যবসাদার হতে হবে। মা এসব বন্ধ করো এভাবে সং সেজে পাত্রপক্ষের সামনে বসে বসে আমি ক্লান্ত। আমার আর ভালো লাগেনা মা।
রমলাও যে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবেনি তার নয়। ঘটক লাগানো, আত্মীয় স্বজনকে বলে রাখা ,মন্দিরে মন্দিরে মানত করা কিছুই বাদ দেননি। কিন্তু কোথায় কী। পাত্রপক্ষ আসে, খায়দায়, বাড়ি ফিরে 'পছন্দ হয়নি' জানিয়ে দেয়। বিরক্তিকর।
কয়েকদিন আগে বৌদি এক ঠাকুর বাড়ির কথা বলছিলো। ওখানে গেলে নাকি কেউ খালি হাতে ফেরেনা। খুব জাগ্রত ঠাকুর।
কয়েকদিন পর বৌদির সঙ্গে সেখানে রমলা দেখলেন কালী মূর্তির সামনে একজন মহিলা বসে পূজো করছেন। ঘরে অনেক গুলো ধূপ মোমবাতি জ্বলছে। প্রায় অন্ধকার ঘরে তাঁকে ঘিরে বসে আছে আরো কুড়ি পঁচিশ জন মহিলা-পুরুষ। সবাই খুব চুপচাপ।
একজন এসে বললেন, আপনারা বসুন। নাম বলুন। মা এখনই জাগ্রত হবেন। নাম ধরে ডাকলে যা বলার মাকে গিয়ে বলবেন। রমলা নিজের নাম বললো। ভদ্রলোক লিখে নিলেন।
বৌদি ফিসফিস করে বলল, কতলোক দেখছো? প্রত্যেকে কিছু সমস্যা নিয়েই মায়ের কাছে এসেছে। একটু পরেই ভদ্রলোক নাম ডাকলেন। একজন মহিলা একটু এগিয়ে বসলেন।
হঠাৎ ঐ পূজো করা মহিলা ঘুরে বসলেন। তার খোলা এলো মেলো চুলে মুখ ঢেকে যাচ্ছে। কপালে ঘেঁটে যাওয়া বড়ো সিঁদুরের টিপ। চোখ দুটো লালচে। এগিয়ে যাওয়া মহিলা তার সমস্যার কথা বললেন মা উত্তর দিলেন জড়ানো গলায়। এতো দুর থেকে রমলা সব কথা পরিষ্কার করে শুনতে পেল না। এক সময় রমলার ডাক পড়ল। হঠাৎ বুকটা একটু কেঁপে উঠলো মনে হলো। এগিয়ে গিয়ে কাঁপা গলায় রমলা নিজের মেয়ের বিয়ের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলে মায়ের হাত ধরে ফেললেন। মা ভীষন রেগে গিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জড়ানো গলায় বিস্ফারিত চোখে বললেন,আমায় ছুঁলি কেন? আমায় ছুঁলি কেন??ঐ ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে রমলার দিকে তাকিয়ে মায়ের গায়ে গঙ্গা জল ছড়িয়ে দিলেন। ততক্ষণে মা মাটিতে মাথা ঘষছেন। মুখে ঘড়ঘড় আওয়াজ। রমলা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে রইলেন।কিছুক্ষণ পর উনি স্বাভাবিক হয়ে রমলার সব কথা শুনলেন। বললেন সামনের অমাবস্যা তিথিতে মহাযজ্ঞ করতে হবে। রমলাকে কিছু করতে হবে না।সব ব্যবস্থা মন্দির থেকেই করা হবে। আপাতত পঁচিশ হাজার টাকার মত খরচা।
তারপর রমলাকে কয়েক বার মন্দিরে যাতায়াত করতে হয়েছে। শেষে মা একটু ফুল দিয়েছেন অচলার হাতে রূপোর মাদুলী করে পরতে হবে আর কয়েকটি বিশেষ মন্ত্রপুতঃ ফুল দিয়ে বলেছেন, একমাসের কমদিন বিয়ে হয়েছে এমন নবদম্পতির বিছানার নীচে এই ফুলগুলো নতুন কাপড়ের টুকরোয় বেঁধে রেখে দিতে হবে।
অচলার হয়তো সৌভাগ্যের দিন এসে গিয়েছিল।কারন ওদের পাশের বাড়িতেই কয়েক দিন আগেই একটি ছেলের বিয়ে হয়েছে। সেখানে ওর দাদার একার নেমন্তন্ন ছিল।
রমলা একদিন দুপুরে নববধূর শাশুড়িমাকে কোথাও বেরোতে দেখলো। এই সুযোগেই
ওদের বাড়ির গিয়ে বলল, কি গো দিদি কি করছো? দরজা খোল? তোমার নতুন বৌমাকে দেখতে এলাম।
নব বধু বললো, মা তো এখন বাড়ি নেই।
আমিতো তোমাকেই দেখতে এসেছি মা। তুমিতো আছো। আমি পাশের বাড়ির কাকিমা হই। বাড়িতে আসতে বলবে না মা! রমলা মিষ্টি হেসে কথা গুলো বললো।
নববধূ ইতস্তত করলেও নিজের ঘরে নিয়ে গেল।
রমলা ঘরের আসবাবপত্র ও গায়ের গয়না দেখে খুব প্রশংসা করলো। বউ যে খুব সুন্দরী তাও জানাতে ভুললো না। নববধূ ভদ্রতা করে মিষ্টি জল আনতে গেলে সঙ্গে আনা ফুল বিছানার ভাঁজে ঢুকিয়ে দিল।
যাওয়ার সময় নববধূর গাল টিপে আদর করে দিল।
কয়েক মাসের মধ্যে অচলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। পাত্র বেশ সুন্দর। নিজের দোতলা বাড়িতে মাকে নিয়ে সংসার। বাড়ির নীচের তলায় মুদীর দোকান। ধূমধাম করে অনুষ্ঠান করে অচলার বিয়ে হলো। অনেক লোকজন সেই বিয়েতে উপস্থিত থাকলেও সেই নববধূ ছিলনা। কারণ সে তখন বদ্ধ উন্মাদ।
কথায় বলে "তুকতাক ছ'মাস/কপালের ভোগ বারো মাস"
কয়েক মাস পরেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে অচলা ও তার মায়ের মৃত্যু হলো। আর সেই নববধূর আজ স্বামী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ।
🆃 🅷 🅰 🅽 🅺 🆈 🅾 🆄


